সিলেট

২৩১ চা বাগানে একযোগে ভোটগ্রহণ, নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষায় চা শ্রমিকেরা

নতুন সিলেট প্রতিবেদক:

নতুন সিলেট প্রতিবেদক:

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৭:০১

২৩১ চা বাগানে একযোগে ভোটগ্রহণ, নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষায় চা শ্রমিকেরা

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ত্রিবার্ষিক নির্বাচনকে ঘিরে। আগামী ২৮ নভেম্বর দেশের ২৩১টি চা বাগান ও পঞ্চায়েত এলাকায় একযোগে অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ। এতে প্রায় এক লাখ চা শ্রমিক তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চা বাগানগুলোতে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে ভ্যালি ও পঞ্চায়েত পর্যায়েও সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে শুরু হয়েছে নির্বাচনি তৎপরতা।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শ্রম অধিদপ্তরের অধীনে গঠিত ‘বাচাশ্রই নির্বাচন কমিশন, ২০২৬’ সম্প্রতি নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করেছে। শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদের স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে নির্বাচনের এ তফশিল ঘোষণা করা হয়।

চা শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৬৭টি মূল ও ৬৪টি ফাঁড়ি চা বাগান রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে ৯৩টি চা বাগান। প্রতিটি বাগানে একটি করে পঞ্চায়েত রয়েছে। এসব পঞ্চায়েতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১৫ সদস্যের কমিটি নির্বাচিত হবে। একই দিনে ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সাতটি ভ্যালির নেতৃত্ব নির্বাচনেও ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

ইউনিয়নের সাতটি ভ্যালি হলো—লস্করপুর, বালিশিরা, মনু-ধলাই, লংলা, জুড়ী, সিলেট ও চট্টগ্রাম। প্রতিটি ভ্যালির অধীনে রয়েছে ২৫ থেকে ৩০টি বাগান পঞ্চায়েত।

এবারের নির্বাচনে সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। পাশাপাশি অংশ নিতে পারে ছয় শতাধিক প্যানেল। তফশিল ঘোষণার পর থেকেই কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করেছেন।

কেন্দ্রীয় সভাপতি পদে রামভাজন কৈরী, রাজু গোয়ালা ও পঙ্কজ কন্দ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে নিপেন পাল ও পরেশ কালিন্দির নেতৃত্বাধীন প্যানেল নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তফশিল ঘোষণার পর ভ্যালি ও পঞ্চায়েত পর্যায়েও প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের প্রার্থিতা ঘোষণা করবেন বলে জানা গেছে।

দীর্ঘদিন পর ভোটের সুযোগ পেয়ে চা শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। তবে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন—এমন যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রত্যাশা করছেন ভোটাররা।

মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি, সময়মতো বেতন পরিশোধ, শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, সন্তানদের সুশিক্ষার ব্যবস্থা এবং জীবনমান উন্নয়নের বিষয়গুলো এবারের নির্বাচনে ভোটারদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

লাখাইছড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত সভাপতি ও সম্ভাব্য প্রার্থী শ্যামল বৈদ্য অভিযোগ করে বলেন, অতীতে অনেকে নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর শ্রমিকদের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এবার ভোটাররা অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দেওছড়া চা বাগানের রাধেশ্যাম বাউরী ও কাকিয়াছড়া চা বাগানের অতুল কুর্মী জানান, শুধু নির্বাচনে জয়ী হওয়াই বড় কথা নয়। চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দৈনিক মজুরি বৃদ্ধির দাবি, সময়মতো বেতন পরিশোধ, সন্তানদের সুশিক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নে যাঁরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন, ভোটাররা এবার এমন সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বই বেছে নিতে চান।

শ্রীমঙ্গল শ্রম অধিদপ্তরের উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন জানান, আগামী ২৮ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত গোপন ব্যালটের মাধ্যমে একটানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান জানান, শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের তফশিল ঘোষণা করা হয়েছে।

মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল জানান, নির্বাচন উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় দীর্ঘ আট বছর ধরে কেন্দ্রীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ২৪ জুন ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুযায়ী ২০২১ সালেই নতুন কমিটি নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় নির্বাচন না হওয়ায় তিন বছরের জন্য নির্বাচিত কমিটিই টানা আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছে।

সিলেট থেকে আরো পড়ুন