ছবি: সংগৃহীত
‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’—এই আকাঙ্ক্ষা শুধু কবিতার পঙ্ক্তি নয়, একটি জাতির আত্মমর্যাদার উচ্চারণ। এ উচ্চারণ হাজার বছরের বাংলার শ্রেষ্ঠতম দার্শনিক প্রতিনিধির। যিনি তার জীবনব্যাপী কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছেন বাঙালি তথা বিশ্বমানবের অতুলনীয় প্রেরণা। বাঙালির চেতনা বিকাশ ও আত্মিক মুক্তির প্রতীক তিনি। আজ ২৫ বৈশাখ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বহুমাত্রিক উৎকর্ষের মহানায়ক বরেণ্য এই বাঙালি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী।
২৫ বৈশাখ কেবল একটি জন্মদিনের দিনপঞ্জি নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ভাষার দীপ্তি এবং মানবিকতার মহোৎসব। সময়ের ক্যালেন্ডারে ১৬৫ বছর পেরোলেও তার উপস্থিতি বাঙালির মনন, সংস্কৃতি ও প্রতিদিনের জীবনবোধে এতটাই জীবন্ত যে, তাকে কখনো অনুপস্থিত ভাবা যায় না।
১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ (৭ মে ১৮৬১), কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উজ্জ্বলতম এই নক্ষত্র। ব্রাহ্মধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদাসুন্দরী দেবীর সন্তান রবীন্দ্রনাথ শৈশবেই প্রতিভার আভাস দেন। মাত্র আট বছর বয়সে কবিতা রচনা শুরু করা সেই বালক একসময় হয়ে ওঠেন এমন এক বিশ্বমানব, যার কণ্ঠে বাংলা ভাষা লাভ করে নতুন সুর, নতুন ব্যঞ্জনা, নতুন বিশ্বজনীনতা।
রবীন্দ্রনাথকে কেবল কবি বললে তার বিস্তৃতিকে ধরা যায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সুরস্রষ্টা, শিক্ষাচিন্তক, ভাষাবিদ, চিত্রশিল্পী, দার্শনিক এবং মানবতাবাদী। তার সৃষ্টির পরিসর বিস্ময়কর। ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস, ৩৬টি প্রবন্ধগ্রন্থ, অসংখ্য ছোটগল্প, চিঠিপত্র ও দুই হাজারেরও বেশি গান। বাংলা সাহিত্যে এমন সর্বব্যাপ্ত প্রতিভার তুলনা দুর্লভ। কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় তার সৃষ্টির গভীরতা। মানুষের আনন্দ, বেদনা, প্রেম, বিরহ, নিঃসঙ্গতা, প্রতিবাদ, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা—সব মানবিক অনুভব তার রচনায় এমন স্বাভাবিকতায় ধরা পড়েছে যে, যুগ পাল্টালেও তা পুরোনো হয় না। ‘চারুলতা’র নীরব একাকিত্ব, ‘বিনোদিনী’র আত্মসচেতন বিদ্রোহ, ‘গোরা’র জাতিসত্তা ও স্বদেশচিন্তার দ্বন্দ্ব, কিংবা ‘রক্তকরবী’র শোষণবিরোধী প্রতীকী ভাষা—সবখানেই আজকের পাঠক নিজের সময়কে আবিষ্কার করেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক আত্মীয়তার চেয়েও গভীরতর। তার পূর্বপুরুষরা খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগে বাস করতেন। জমিদারি তদারকির সূত্রে তিনি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, নওগাঁর পতিসরসহ বাংলার নানা প্রান্তে। পদ্মার তীর, গ্রামীণ মানুষের জীবন, বাংলার প্রকৃতি ও কৃষকের সুখ-দুঃখ তার সৃষ্টিকে নতুন প্রাণ দিয়েছে। ‘সোনার তরী’ থেকে ‘ছিন্নপত্র’—বাংলাদেশের মাটি, জল, আলো, বাতাসে তার সাহিত্য বহুবার নবজন্ম লাভ করেছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ তারই রচনা, যা এই ভূখণ্ডের সঙ্গে তার সম্পর্ককে রাষ্ট্রিক মর্যাদায় উন্নীত করেছে।
রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তি ছিল শুধু ব্যক্তিগত সম্মান নয়, বাংলা ভাষার বিশ্বস্বীকৃতি। ১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি উপনিবেশিত জাতির ভাষাকেও বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেন। আজও সেই অর্জন বাঙালির সাংস্কৃতিক গর্বের অন্যতম শিখর।
আজ জন্মজয়ন্তীতে দেশব্যাপী নানা আয়োজনে স্মরণ করা হচ্ছে কবিগুরুকে। যথাযথ মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে দেশব্যাপী দিবসটি উদযাপন করবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়৷ কবির এবারের জন্মবার্ষিকীর মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ’। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে কুষ্টিয়ার শিলাইদহসহ কবির স্মৃতিবিজড়িত জেলাগুলোয় নেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি। এ বছর কুষ্টিয়ার শিলাইদহে তিন দিনব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনিবার্য কারণবশত প্রধানমন্ত্রী ওই অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। কুষ্টিয়ার পাশাপাশি কবির স্মৃতিবিজড়িত নওগাঁর পতিসরেও বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পতিসরের আয়োজনে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
অন্যদিকে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এ ছাড়া কবির স্মৃতিধন্য খুলনার দক্ষিণডিহিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
জাতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় প্রায় এক ঘণ্টার একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান (নৃত্য, সংগীত ও আবৃত্তি) পরিবেশিত হবে। এ ছাড়া, ঢাকাসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও রচনা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হবে। পাশাপাশি কবির ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে বিশেষ স্মরণিকা ও পোস্টার মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়েছে। বরাবরের মতো ছায়ানটও বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করছে। কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ২৮শে বৈশাখ (১১ই মে) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি ‘রবীন্দ্র পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান করবে। এবার পুরস্কার পাচ্ছেন রবীন্দ্রসাহিত্যের গবেষণায় অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ এবং রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় শিল্পী বুলবুল ইসলাম।
শিল্প সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন