বাংলাদেশ

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিক

নতুন সিলেট ডেস্ক :

নতুন সিলেট ডেস্ক :

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৫২

চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিক

ছবি সংগৃহীত :

উচ্চ বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন বাংলাদেশিসহ অন্তত ২৯টি দেশের নাগরিক। বেসামরিক চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদেশিদের রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এবং প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন।

একই প্রতিবেদনে ইউক্রেনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলাকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

যুদ্ধবন্দি গাইবান্ধার রিমেল মিয়ার করুণ অভিজ্ঞতা
গাইবান্ধার ২৭ বছর বয়সী রিমেল মিয়া ভালো জীবনের আশায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন।

সেখানে কাজের সুযোগ পেতে ঢাকার একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রকে ধারদেনা করে ছয় লাখ টাকা দেন তিনি। পরে নয় মাসের কাজের অনুমতি নিয়ে রাশিয়ার তায়মেন শহরে একটি গ্যাস কোম্পানিতে চাকরি পান।

কিন্তু ছয় মাসের মাথায় তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়। পরে মস্কো হয়ে উফা শহরে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশি মুদ্রায় মাসে দুই লাখ টাকা বেতন এবং এককালীন ২০ লাখ রুশ রুবল দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।


কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীর চাকরির কথা বলে তাকে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। পরে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে আটক হয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে রয়েছেন তিনি। রিমেল মিয়ার মতো আরও অন্তত দুই বাংলাদেশি ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

২৯ দেশের নাগরিককে নিয়োগে প্রতারণার প্রমাণ
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ৪৮টি দেশের নাগরিকদের নিয়োগপ্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে। এর মধ্যে ২৯টি দেশের নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রতারণা, জবরদস্তি ও মানবপাচারের প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তান রয়েছে। তবে ২৯টি দেশের তথ্য পাওয়ার অর্থ এই নয় যে অন্য দেশের নাগরিকদের একইভাবে নিয়োগ করা হয়নি; তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের এ চক্রের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাদের বড় অংশই আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নিয়োগকারী সংস্থা এবং স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে রাশিয়ায় নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, মেকানিক, বৈদ্যুতিক কাজের লোক, নির্মাণশ্রমিক ও ঝালাইকারীর চাকরির প্রলোভন দেখানো হতো। কোথাও খেলাধুলা, কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে আশ্বস্ত করা হতো, চাকরির সঙ্গে সামরিক বাহিনী বা যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশি নাগরিকদের দেওয়া বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রতিশ্রুতিসংবলিত ব্যবসায়িক ভিসার নমুনাও পেয়েছে তদন্ত কমিশন।

বিদেশে নেওয়ার জন্য দালালরা জনপ্রতি ৪০০ থেকে ৮ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত কমিশন বা যাতায়াত খরচ নিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব খরচ পরে বেতন থেকে কেটে নেওয়ার চুক্তি করা হতো। 

রাশিয়ায় পৌঁছেই কেড়ে নেওয়া হতো পাসপোর্ট
তদন্তে উঠে এসেছে, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেক বিদেশিকে স্থানীয় এজেন্টরা অস্থায়ী আবাসন বা শিবিরে নিয়ে যেত। পরে তাদের রুশ সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হতো। অধিকাংশের রুশ ভাষা জানা না থাকলেও তাদের সেই ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হতো।

চুক্তিতে সইয়ের আগে অনেকের মুঠোফোন, পাসপোর্ট ও গাড়ি চালানোর অনুমতিপত্র কেড়ে নেওয়া হতো। ফলে চুক্তির শর্ত বোঝা কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ত। সই করতে অস্বীকৃতি জানালে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

রাশিয়ায় আগে থেকেই কর্মরত বা অভিবাসী হিসেবে থাকা কিছু ব্যক্তিকেও আইনি জটিলতা, পুলিশি আটক কিংবা কারাদণ্ডের ভয় দেখিয়ে সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামরিক চুক্তিতে সইয়ের পর বিদেশি নাগরিকদের কাউকে মাত্র ২০ মিনিট, আবার কাউকে সর্বোচ্চ এক মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

তাদের দিয়ে পরিখা খনন, সামনের সারিতে আক্রমণ, সেনাদের খাবার ও পানি সরবরাহ এবং নিহত সেনাদের মরদেহ সংগ্রহের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো হতো। পিছু হটার চেষ্টা করলে গুলিতে নিহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। প্রতিশ্রুত বেতন ও বোনাস না পাওয়া, ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ তুলে নেওয়া কিংবা হিসাব বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

প্রতিবেদনে ৩০ জনের একটি দলের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। ওই দলের ১৭ জন সম্মুখযুদ্ধে নিহত হয়েছেন, পাঁচজন নিখোঁজ এবং মাত্র একজন আহত অবস্থায় ফিরে আসতে পেরেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 
 
ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলাও মানবতাবিরোধী অপরাধ
বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগের পাশাপাশি ইউক্রেনের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলার বিষয়টিও তদন্ত করেছে জাতিসংঘের কমিশন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র, উপকেন্দ্র, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায় ধারাবাহিক হামলার কারণে ইউক্রেনের বহু এলাকায় বিদ্যুৎ, পানি ও তাপ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ২০২৫-২৬ সালের শীতকালে তাপমাত্রা মাইনাস ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাওয়ার সময় এসব সংকট সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।

কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বেসামরিক মানুষের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য সেবাগুলো থেকে তাদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে এসব হামলা চালানো হয়েছে। এ কারণে রুশ কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিশন। একই সঙ্গে ইউক্রেনীয় বাহিনীর রুশ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার বিষয়েও তদন্তের সীমাবদ্ধতার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

বিদেশি নাগরিকদের মুক্তি ও দেশে ফেরানোর সুপারিশ
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন প্রতারণা ও জবরদস্তির শিকার হয়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া বিদেশিদের অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে নিজ দেশে ফেরানোর সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে নিয়োগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

কমিশনের মতে, প্রতারণার শিকার হয়ে যুদ্ধে জড়ানো এসব বিদেশিকে শুধু যোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা না করে মানবপাচারের ভুক্তভোগী হিসেবেও দেখতে হবে। ইউক্রেনের হাতে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যুদ্ধবন্দিদের সুরক্ষাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে এবং নিরাপদে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে মানবপাচার প্রতিরোধে আইন ও নীতি পর্যালোচনা, বিদেশে আটকে পড়া নাগরিকদের ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন