ধর্ম

মৃত্যুর পরও যে ৬ কারণে আমলনামায় গুনাহ জমা হয়

ধর্ম ডেস্ক:

ধর্ম ডেস্ক:

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ১৫:১৮

মৃত্যুর পরও যে ৬ কারণে আমলনামায় গুনাহ জমা হয়

ছবি: সংগৃহীত

মানুষের দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। মৃত্যুর মাধ্যমে পার্থিব জীবনের ইতি ঘটে এবং নিজের পক্ষ থেকে নতুন আমল করার সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়। তবে মানুষের কাজের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর পরও পৃথিবীতে থেকে যায়। সেই প্রভাব কল্যাণকর হলে মৃত ব্যক্তি সওয়াবের অধিকারী হন, আর তা পাপের কারণ হলে গুনাহের অংশীদার হতে পারেন।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমল ছাড়া- সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)

অর্থাৎ, মৃত্যুর পর নিজের পক্ষ থেকে নতুন আমল করার সুযোগ বন্ধ হলেও জীবদ্দশায় রেখে যাওয়া কিছু কাজের প্রভাব অব্যাহত থাকে। কেউ যদি অন্যায় পথ বা পাপের উপকরণ ছড়িয়ে যায় এবং পরবর্তী সময়ে মানুষ তা অনুসরণ করতে থাকে, তাহলে সেই পাপের দায়ও তার আমলনামায় যুক্ত হতে পারে।

মানুষের রেখে যাওয়া প্রভাবও সংরক্ষিত হয়
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, মানুষের নিজের কাজের পাশাপাশি তার রেখে যাওয়া কর্মপ্রভাবও সংরক্ষিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘নিশ্চয় আমিই মৃতদের জীবিত করি এবং তারা আগে যা পাঠিয়েছে ও যা পেছনে রেখে গেছে, আমি প্রত্যেক বিষয়কে স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষিত রেখেছি।’ (সুরা ইয়াসিন: ১২)

অর্থাৎ, জীবদ্দশায় শুরু করা ভালো বা মন্দ কাজের যে প্রভাব পরবর্তী সময়ে অব্যাহত থাকে, সেটিও আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকে।

অন্যদের বিভ্রান্ত করার পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ফলে কেয়ামতের দিন তারা বহন করবে তাদের পাপের বোঝা পূর্ণ মাত্রায় এবং তাদেরও পাপের বোঝা যাদেরকে তারা অজ্ঞতাবশত বিভ্রান্ত করেছে।’ (সুরা নাহল: ২৫)

একই বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তারা তো বহন করবে নিজেদের ভার এবং নিজেদের বোঝার সাথে আরো কিছু বোঝা; আর তারা যে মিথ্যা রটনা করত সে সম্পর্কে কেয়ামতের দিন অবশ্যই তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে।’ (সুরা আনকাবুত: ১৩)

পাপের ধারাবাহিক দায় নিয়ে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সতর্কবার্তা
সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো মন্দ প্রথা চালু করে, তার ওপর এর গুনাহ বর্তাবে। আর তার পরে যারা সেই অনুযায়ী আমল করবে, তাদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহও তার ওপর বর্তাবে। এতে তাদের গুনাহের কোনো কমতি হবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ১০১৭)

এই হাদিসের প্রেক্ষাপটে রাসুলুল্লাহ (স.) মানুষকে সদকা করতে উৎসাহিত করেছিলেন। একজন সাহাবি এগিয়ে এলে অন্যরাও তাকে অনুসরণ করে সদকা করেন। এ ঘটনায় তিনি ভালো ও মন্দ প্রথা চালুর পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেন। অর্থাৎ, কেউ ভালো কাজের সূচনা করলে পরবর্তী অনুসরণকারীদের সমপরিমাণ সওয়াব পেতে পারেন। একইভাবে মন্দ কাজের প্রচলন করলে অনুসরণকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহও তার ওপর বর্তাতে পারে।

অন্য এক বর্ণনায় তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে কোনো ভ্রান্ত পথের দিকে আহ্বান জানাবে, তার ওপর সেই পথ অনুসরণকারীদের সমপরিমাণ গুনাহ বর্তাবে। এতে অনুসরণকারীদের গুনাহের কোনো কমতি হবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬৭৪)

হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রেও এ নীতির দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, অন্যায়ভাবে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পাপের একটি অংশ আদম (আ.)-এর প্রথম সন্তানের ওপর বর্তায়। কারণ, সেই-ই পৃথিবীতে প্রথম হত্যার প্রচলন করেছিল। (সহিহ বুখারি: ৩৩৩৫)

যেসব কারণে মৃত্যুর পরও গুনাহ যুক্ত হতে পারে

১. অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়া
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাপ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। কেউ অশ্লীল ছবি, ভিডিও, গান বা পাপের কাজে উৎসাহিত করে এমন কনটেন্ট প্রকাশ করলে এবং এর মাধ্যমে অন্যরা পাপে জড়ালে তার দায়ও প্রকাশকারীর ওপর আসতে পারে।

কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পরও তার প্রকাশিত কনটেন্ট ইন্টারনেটে থেকে যেতে পারে। মানুষ সেগুলো দেখে বা শেয়ার করে পাপে জড়ালে এবং এর প্রচারে প্রকাশকারীর দায় বা সহযোগিতা থাকলে সে গুনাহের অংশীদার হবে।

২. দ্বীনের নামে ভুল শিক্ষা প্রচার করা
কেউ ধর্মের নামে যাচাই না করে ভুল তথ্য প্রচার করলে, ভিত্তিহীন বিশ্বাস ছড়িয়ে দিলে কিংবা মানুষকে অন্যায় ও অনৈতিকতার দিকে আহ্বান জানালে এর প্রভাব মৃত্যুর পরও চলতে পারে। বই, প্রবন্ধ, ভিডিও বা বক্তৃতার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া ভুল শিক্ষা অনুসরণ করে মানুষ পাপে জড়ালে প্রচারকও এর দায় থেকে মুক্ত থাকবেন না।

বিশেষ করে কোরআন-হাদিসের নামে কোনো কথা প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

৩. অন্যায় প্রথা ও ক্ষতিকর সংস্কৃতি চালু করা
কেউ সমাজে কোনো অন্যায় প্রথা চালু করল, যা পরবর্তী সময়ে অন্যরা অনুসরণ করতে থাকল। যেমন, যৌতুকের মতো সামাজিক অন্যায়কে উৎসাহিত করা, অশালীন আয়োজনের প্রচলন করা কিংবা অপচয়ের প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে দেওয়া। মানুষ সেই প্রথা অনুসরণ করে অন্যায় করলে এর প্রবর্তকও গুনাহের অংশীদার হবেন।

একইভাবে ধর্মের নামে শরিয়তবিরোধী কোনো মনগড়া ইবাদত বা রীতি প্রচলন করে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করলেও এর দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। তবে শরিয়তসম্মত কোনো নতুন ব্যবস্থা বা বৈধ সামাজিক রীতিকে বিদআত বলা যাবে না।

৪. পাপের কাজে সহযোগিতার মাধ্যম তৈরি করা
কেউ জেনে-বুঝে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা বা ব্যবস্থা গড়ে তুলল, যার মাধ্যমে সুদ, জুয়া, মাদক কিংবা অন্যকোনো হারাম কাজ পরিচালিত হয়। তার মৃত্যুর পরও সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্যায় চলতে থাকলে এর দায় তার ওপর আসবে।

তবে কোনো ব্যক্তি বৈধ উদ্দেশ্যে কোনো কিছু তৈরি করার পর অন্যরা সেটি অপব্যবহার করলে নির্মাতাকে দায়ী করা যাবে না। অন্যায়ের উদ্দেশ্য, সরাসরি সহযোগিতা ও সংশ্লিষ্টতা এখানে বিবেচ্য।

৫. ভ্রান্ত ফতোয়া দেওয়া
ধর্মীয় বিষয়ে না জেনে ফতোয়া দেওয়া গুরুতর অপরাধ। কেউ নিজের অজ্ঞতা বা ভুল বোঝার কারণে ভুল ফতোয়া দিলে এবং মানুষ তার ওপর নির্ভর করে ভুল পথে পরিচালিত হলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। একইভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থে জেনে-বুঝে আল্লাহর বিধান বিকৃত করে হারামকে হালাল বলে প্রচার করা গুরুতর গুনাহ। তার কথায় প্রভাবিত হয়ে অন্যরা সেই ভুল সিদ্ধান্ত অনুসরণ করলে তাদের পাপের দায় তার ওপরও আসতে পারে।

৬. সন্তান ও পরিবারকে অন্যায়ের পথে পরিচালিত করা
সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিকতা থেকে দূরে রাখা, অন্যায়ে উৎসাহিত করা কিংবা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করার কারণে পিতা-মাতা গুনাহগার হতে পারেন। সন্তানকে ভালো-মন্দের শিক্ষা দেওয়া এবং সঠিক পথে পরিচালিত করা তাদের দায়িত্ব।

তবে সন্তান নিজের ইচ্ছায় যে অন্যায় করে, তার সব দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পিতা-মাতার ওপর বর্তায় না। কিন্তু পিতা-মাতা যদি তাকে অন্যায়ের শিক্ষা দেন, পাপের কাজে সহযোগিতা করেন বা ভুল পথে পরিচালিত করেন, তাহলে সেই সংশ্লিষ্টতার জন্য তাদেরও জবাবদিহি করতে হবে।

মুক্তির উপায়: মৃত্যুর আগেই পাপের পথ বন্ধ করা
মৃত্যুর পর মানুষের নিজের পক্ষ থেকে তওবা ও নতুন আমল করার সুযোগ থাকে না। তাই জীবিত থাকতেই নিজের ছড়িয়ে দেওয়া ভুল ও পাপের প্রভাব দূর করার চেষ্টা করা জরুরি।

ডিজিটাল পাপের উপকরণ মুছে ফেলা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত নিজের অশ্লীল বা পাপের কাজে উৎসাহিত করে এমন কনটেন্ট সরিয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে মৃত্যুর পর অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করার জন্য বিশ্বস্ত কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

ভুল শিক্ষা সংশোধন করা: অতীতে কাউকে ভুল তথ্য দিয়ে থাকলে বা পাপের পথে পরিচালিত করলে জীবিত থাকতেই সেই ভুল সংশোধন করতে হবে। যাদের কাছে ভুল তথ্য পৌঁছেছে, তাদের কাছে সঠিক বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তবে যারা তওবা করে, নিজেদের সংশোধন করে এবং সত্যকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে, আমি তাদের তওবা কবুল করি।’ (সুরা বাকারা: ১৬০)

কল্যাণকর কাজ রেখে যাওয়া: মানুষের উপকারে আসে এমন কাজ করে যেতে হবে। দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া, উপকারী বই প্রকাশ করা, মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণে সহযোগিতা করা এবং সদকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

মৃত্যুর পর নিজের রেখে যাওয়া কাজ যেন মানুষকে পাপের পথে পরিচালিত না করে, সে বিষয়ে জীবিত থাকতেই সচেতন হওয়া জরুরি। তাই কথা, লেখা, শিক্ষা, পোস্টসহ প্রতিটি কাজের পরিণতি ভেবে দেখা উচিত। দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার আগে এমন কিছু রেখে যাওয়া প্রয়োজন, যা মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে এবং আখেরাতে নাজাত ও সওয়াবের কারণ হয়।

তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি: ৩৩৩৫; সহিহ মুসলিম: ১০১৭, ১৬৩১, ২৬৭৪; সুরা ইয়াসিন: ১২; সুরা নাহল: ২৫; সুরা আনকাবুত: ১৩; সুরা বাকারা: ১৬০

ধর্ম থেকে আরো পড়ুন