রাজনীতি

বিদ্যুৎখাতে লুটপাট করতেই দায়মুক্তি আইন পাস করেছিল আ. লীগ: রিজভী

নতুন সিলেট ডেস্ক:

নতুন সিলেট ডেস্ক:

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:২৬

বিদ্যুৎখাতে লুটপাট করতেই দায়মুক্তি আইন পাস করেছিল আ. লীগ: রিজভী

ছবি: সংগৃহীত

বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করতেই বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দায়মুক্তি আইন পাস করেছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ও ক্যাব যুব সংসদ আয়োজিত ‘রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও শৈলকুপা পৌরসভা এলাকায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্ভাব্যতা যাচাই ও লাইফলাইন গ্রাহক সমীক্ষা: ফলাফল ও বাস্তবায়ন’ শীর্ষক গণসংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গণসংলাপে সভাপতিত্ব করেন ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া। এ সময় ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম. শামসুল আলম, গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

রিজভী বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রতিটি খাত ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের প্রতিটি কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকতে হবে। কোনো খাতই জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না। বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করতেই বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দায়মুক্তি আইন পাস করেছিল

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরূপণের যে গবেষণা করা হয়েছে, তাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে। গবেষণাটির মূল প্রবন্ধ যতটুকু আমি পড়েছি, তাতে আমার কাছে বিষয়টি বস্তুনিষ্ঠ মনে হয়েছে। সেখানে প্রচলিত পরিসংখ্যানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে, সেই তথ্যের ভিত্তি ও যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাত্রা বিবেচনা করে কাউকে হতদরিদ্র বা চরম দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা কতটা যথাযথ, তা যাচাই করা প্রয়োজন। গবেষণার ক্ষেত্রে কোনো একটি সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত ধরে নেয়ার পরিবর্তে বিকল্প ব্যাখ্যা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নেয়া জরুরি।

গবেষণায় প্রশ্ন তোলার গুরুত্ব তুলে ধরে রিজভী বলেন, শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশ্ন করা। পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা প্রশ্নের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না, কিন্তু তিনি প্রশ্নের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চা করেছেন। পরবর্তী সময়ে প্লেটো একাডেমি এবং অ্যারিস্টটল লাইসিয়াম প্রতিষ্ঠা করেন। প্রশ্ন করার এই চর্চাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

রিজভীর মতে, আলোচ্য গবেষণারও উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিসংখ্যানকে ভিত্তি হিসেবে নেয়া হলেও সেই পরিসংখ্যানের মাধ্যমে দারিদ্র্যের প্রকৃত চিত্র কতটা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রাখা হয়েছে। বিশেষ করে শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের মধ্যে কারা প্রকৃত অর্থে চরম দরিদ্র, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি।


নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কুড়িগ্রামের ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। কোথাও বিদ্যুৎ পৌঁছালেও আশপাশের তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারগুলো সুবিধা পেতে পারে, কিন্তু অনেক পরিবার সেই সুযোগের বাইরে থেকে যায়। ফলে দেশের সর্বত্র বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ সমান নয়।

দারিদ্র্যের সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রিজভী ঢাকার বস্তি এলাকার বাস্তবতার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে অনেক দরিদ্র মা-বাবা কঠোর পরিশ্রম করে সন্তানদের পড়াশোনা করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পরিবারের সদস্যদের বিদ্যুৎ ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। একজনের পড়াশোনা শেষ হলে অন্যজন পড়তে বসে। কখনো দিনের বেলায় পড়াশোনার সুযোগ না পেয়ে রাতে পালা করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়। এমনকি কিছু পরিবারকে হারিকেন জ্বালিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়।

তিনি বলেন, এসব বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে কেবল বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণের ভিত্তিতে হতদরিদ্র মানুষের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা কঠিন। তাই এ ধরনের গবেষণায় মানুষের জীবনযাত্রা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ এবং বিদ্যুৎ ভাগাভাগি করে ব্যবহারের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি গবেষণাটির উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন রিজভী বলেন, বিকল্প জ্বালানির উৎস হিসেবে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা ক্রমেই সামনে আসছে। এ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক একটি কোম্পানির প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশে আসা এবং জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার বিষয়টি তিনি পত্রিকায় পড়েছেন। এ ছাড়া জাপানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে গুরুত্ব পেয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রিজভী বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পরিবার ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারলে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে এ খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের সমস্যার কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হচ্ছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহে অনিশ্চয়তার মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রিজভী বলেন, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ফলে দেশের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং রান্নার চুলা জ্বালানোর মতো দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। ভবিষ্যতে উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা গেলে জ্বালানি খাতে আরও সহযোগিতা পাওয়া সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর কয়েক মাস অতিবাহিত হয়েছে। বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন। তবে নির্বাচিত সরকারের বৈধতা, দেশপ্রেম এবং অঙ্গীকার রক্ষার তাগিদ থাকলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
 

রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন