প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ১১:০৬
ছবি সংগৃহীত :
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আবারও ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি ইরানে নতুন করে হামলা শুরুর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক প্রস্তুতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ অবস্থায় অচিরেই আরেকটি বড় যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে।শনিবার (২৪ অক্টোবর) গালফ নিউজের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এ তথ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা হয়তো আবারও ছোটখাটো অপারেশন এপিক ফিউরি অভিযান চালাতে পারি।’
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ হলো ইরানে হামলার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীর দেওয়া একটি নাম।
এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে পারে। তবে সংঘাত দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করা উচিত, নাকি ধীরে ধীরে এর অবসান হতে দেয়া উচিত- সে বিষয়ে প্রশ্ন রাখেন তিনি।
এদিকে চলতি সপ্তাহান্তে একই ধরনের এক বার্তা দিয়েছিলেন তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাকও।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টম ব্যারাককে প্রশ্ন করা হয়, চলতি সপ্তাহান্তে হামলা হতে পারে কি না। জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই হতে পারে।
ব্যারাক বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। তিনি একটি চুক্তির জন্য উন্মুক্ত, প্রস্তুত ও স্পষ্ট। আমরা মাসের পর মাস ধরে আলোচনার টেবিলে রয়েছি।’
অন্যদিকে, আগামী মঙ্গলবার নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাওয়া ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বারবার ইরানের সরকারকে উৎখাতের অঙ্গীকার করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতেও, ইরানের বিরুদ্ধে আবারও বড় ধরনের হামলা শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই ধ্বংসাত্মক সংঘাতের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষের জন্যই সামরিক উপায়ে সমাধান পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে অভিমত তদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের বাহিনীগুলো এখন বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে নিয়মিত হামলা চালানোর একটি ধারায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুর দিক থেকে কোনো পক্ষই স্থলভাগে বড় ধরনের কোনো আক্রমণ চালায়নি, তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে যেকোনো সময়।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেন পলিসি প্রোগ্রামের পরিচালক সুজান ম্যালনি বলেন, ‘আমার ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই হয়তো হামলা শুরু হতে পারে।’
এ সময় যুদ্ধের বেশ কিছু লক্ষণের কথাও উল্লেখ করেন তিনি, যার মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম ও সৈন্য মোতায়েন, ওই অঞ্চলে অবস্থানরত আমেরিকানদের সতর্কবার্তা প্রদান এবং ইসরায়েলি বাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকা।
ম্যালনি বলেন, মূলত, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। একদিকে মার্কিন অবরোধের ফলে ইরানি জনগণ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, আর অন্যদিকে এই অবরোধ কার্যকর রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ নৌ-সম্পদ ও শক্তি সেখানে আটকে পড়েছে। কূটনীতি অথবা সামরিক পদক্ষেপ—যেকোনো একটি উপায়ে এর একটি সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।
আসন্ন যুদ্ধ নিয়ে পূর্বাভাস দেওয়া প্রায় অসম্ভব
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল বলেছেন, সম্প্রতি এমন কিছু লক্ষণ দেখা গেছে যা ইঙ্গিত দেয় যে নতুন করে হামলা হতে পারে। অর্থাৎ, ইরান অথবা ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুথিদের পক্ষ থেকে হামলার আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রস্তুতির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ‘ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট’ মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার ফলে সেখানে বিমানবাহী রণতরী দলের সংখ্যা সাময়িকভাবে তিনে উন্নীত হতে পারে। এছাড়া, ওই অঞ্চলে আরও একটি ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ পাঠানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
ক্যাম্পবেল আরও জানান, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো সম্প্রতি ইরানে আগের হামলার আদলে একটি ‘শক্তি প্রদর্শন’ করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
তবে নতুন যুদ্ধের সময় সম্পর্কে বিষয়ে তিনি বলেন, ঠিক কখন এমনটা ঘটতে পারে, তা আগে থেকে বলা অসম্ভব। যদি উদ্দেশ্য কেবল ইরানকে আলোচনার টেবিলে আসার জন্য চাপ দেওয়া হয়, তবে এই পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত ব্যাপক।
ক্যাম্পবেলের মতে, সংঘাতের শুরুর তুলনায় ট্রাম্পের হাতে এখন বিকল্পগুলো অনেক সীমিত। কারণ, ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির ফলে যেকোনো সম্ভাব্য স্থল অভিযান পরিচালনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে এমন কোনো নিরাপদ জায়গা নেই যেখানে এই ধরনের অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় হাজার হাজার—এমনকি কোনো কোনো পরিস্থিতিতে দশ হাজারেরও বেশি—সৈন্য মোতায়েন করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।
ক্যাম্পবেল আরও বলেন, যুদ্ধের প্রথম পঞ্চাশ দিনে ইরানে যে ধরনের হামলা হয়েছিল, ঠিক তেমন হামলা আবারও চালানো হলে তা ইরানি শাসনের কৌশলগত অবস্থানে কোনো বড় পরিবর্তন আনবে বলে আমার মনে হয় না। তারা যে বড় ধরনের শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে প্রস্তুত, তা তারা আগেই প্রমাণ করেছে। এমনকি যদি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিবর্তন এনে গুরুত্বপূর্ণ মিশ্র অবকাঠামো বা বেসামরিক স্থাপনাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবুও পরিস্থিতির তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হবে না।
আন্তর্জাতিক থেকে আরো পড়ুন