ছবি: সংগৃহীত
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে রাতের আঁধারে সীমান্ত পেরিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ ভারতীয় অবৈধ মসলাসহ একটি মালবাহী কাভার্ড ভ্যান আটক করেছেন স্থানীয় জনতা। তবে পুলিশকে খবর দেওয়ার পরও সময়মতো ঘটনাস্থলে না আসা এবং পরে আটক মালামাল ও ব্যক্তিদের পার হয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় এক ছাত্রদল নেতার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুর-রানীগঞ্জ-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়কের রানীগঞ্জ বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত এলাকা থেকে একটি মালবাহী কাভার্ড ভ্যান (ঢাকা মেট্রো-ন ২০-৩১৪৩) ভারতীয় মসলার চালান নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাচ্ছিল। রানীগঞ্জ বাজার এলাকায় ভ্যানটির গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে স্থানীয় জনতা চালকসহ ভ্যানটি আটক করেন।
পরে জিজ্ঞাসাবাদে ভ্যানে থাকা ব্যক্তিরা জানান, সিলেটের জৈন্তাপুরের হরিপুর বাজারের ‘মেসার্স আবরার এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক জাকারিয়া আহমেদের মালামাল ঢাকায় নেওয়া হচ্ছিল। তাদের দাবি, ভ্যানে দুই শতাধিক বস্তা ভারতীয় মসলা, যার মধ্যে প্রায় ২০০ বস্তা জিরা রয়েছে এবং এসব পণ্যের মূল্য প্রায় ৩৩ লাখ টাকা। তবে স্বাভাবিক সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ব্যবহার না করে বিকল্প আঞ্চলিক সড়ক দিয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তারা কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
স্থানীয়দের দাবি, জব্দ করা মসলার প্রকৃত বাজারমূল্য আরও বেশি হতে পারে।
ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। এর কিছুক্ষণ পর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল রানীগঞ্জ ইউনিয়ন শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি বিলাল মিয়া কয়েকজন যুবককে সঙ্গে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিলাল মিয়া বলেন, “কী করবেন করেন, ফখরুল ও আমার মাল।” সংবাদ সংগ্রহের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “থানায় কল দেন, প্রশাসন ম্যানেজ করে ব্যবসা করতেছি। পারলে কিছু করেন।” তবে এসব বক্তব্যের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংবাদকর্মী ও স্থানীয়দের ভাষ্য, কাভার্ড ভ্যানটি আটক করার পর প্রথমে জগন্নাথপুর থানা পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে না আসায় পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। ৯৯৯ থেকে জগন্নাথপুর থানায় বার্তা পাঠানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসেনি বলে অভিযোগ করেন তারা।
পরবর্তীতে থানায় যোগাযোগ করা হলে পুলিশ অন্যত্র দায়িত্ব পালনের কথা জানিয়ে সময়ক্ষেপণ করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, সাংবাদিক ও জনতার উপস্থিতি উপেক্ষা করে বিলাল মিয়া প্রভাব খাটিয়ে শ্রমিকদের মাধ্যমে আটক মালামাল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রানীগঞ্জ বাজারের কুশিয়ারা নদীর ফেরিঘাটে নিয়ে যান। পরে নৌকাযোগে তাদের নদী পার করে দেওয়া হয়। মালামাল ও ব্যক্তিদের নদী পার করে দেওয়ার শেষ পর্যায়ে জগন্নাথপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নাজির হোসেন ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও তখন আর কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে এসআই নাজির হোসেন বলেন, রাতে তিনি রানীগঞ্জ এলাকায় অন্য একটি দায়িত্বে ছিলেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই মালামালসহ নৌকাটি স্থান ত্যাগ করায় কাউকে পাওয়া যায়নি।
জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, কেউ আমাকে অবহিত করেনি। জানতে পারলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতো।” ভবিষ্যতে এ ধরনের তথ্য পেলে সরাসরি তাকে জানানোর জন্য অনুরোধ করেন তিনি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুর-রানীগঞ্জ-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়কটি বর্তমানে চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকা দিয়ে আসা অবৈধ পণ্যের চালান এ পথ দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয় বলেও তাদের দাবি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, রানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ফখরুল ইসলাম ও ছাত্রদল নেতা বিলাল মিয়ার সমন্বয়ে একটি চোরাচালান চক্র গড়ে উঠেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত, জব্দ হওয়া মালামাল উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ এবং চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন