মৌলভীবাজারের বড়লেখায় ভোটের ফলাফল নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে প্রায় ৪ বছর ৯ মাস পর নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন রশিদ আহমদ সোনাম।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকালে আদালতের নির্দেশে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুব তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। এ সময় বড়লেখার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাঈমা নাদিয়া, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাওলাদার আজিজুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচনী মামলা ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পদে ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন রশিদ আহমদ সোনাম। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী খসরুজ্জামান মোরগ প্রতীকে নির্বাচন করেন। ভোটগ্রহণ শেষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা খসরুজ্জামানকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।
তবে ভোট গণনার সময় কারচুপির অভিযোগ তোলেন রশিদ আহমদ সোনামের নির্বাচনী এজেন্ট। তাঁর অভিযোগ উপেক্ষা করে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা দ্রুত ফলাফল ঘোষণা করে কেন্দ্র ত্যাগ করেন।
পরে ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে প্রথমে নির্বাচন অফিসে ভোট পুনর্গণনার আবেদন করেন রশিদ আহমদ সোনাম। পরবর্তীতে তিনি মৌলভীবাজারের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলা করেন। ট্রাইব্যুনালে ভোট পুনর্গণনার পর রশিদ আহমদ সোনামকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
ট্রাইব্যুনালের এ রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী খসরুজ্জামান নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন। তবে সেই আপিল খারিজ হয়ে গেলে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল থাকে।
আদালতের রায়ের আলোকে গত বছরের ২২ জুন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন রশিদ আহমদ সোনামকে বিজয়ী ঘোষণা করে সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে। এরপর খসরুজ্জামান ট্রাইব্যুনালের রায় স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট তিন মাসের জন্য রায় স্থগিত করেন।
হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে রশিদ আহমদ সোনাম সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন। মামলাটির নম্বর ২৬৪৩/২০২৫। আপিল বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ৯ জুলাই বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ খসরুজ্জামানের রিট পিটিশন (নম্বর ৮৯১৯/২০২৫) খারিজ করে দেন।
একই সঙ্গে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে আগের স্থগিতাদেশ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও বাতিল ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেন আদালত।
হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ের পর রশিদ আহমদ সোনাম গত ২৭ জুলাই বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ২ আগস্ট মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসকের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করেন। পরে জেলা প্রশাসন আইনগত মতামত নিয়ে ১১ আগস্ট তাঁর শপথের তারিখ নির্ধারণ করে।
শপথ গ্রহণের পর রশিদ আহমদ সোনাম বলেন, “২০২১ সালের নির্বাচনে আমি প্রকৃত বিজয়ী ছিলাম। অনৈতিকভাবে প্রভাব খাটিয়ে কারচুপির মাধ্যমে আমাকে ভোটে পরাজিত দেখানো হয়েছিল। আদালতের রায়ে আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি, সত্যের বিজয় হয়েছে।”
বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম মাহবুব বলেন, “আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হিসেবে রশিদ আহমদ সোনামকে শপথ পড়ানো হয়েছে। এই শপথের মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।”
হাইকোর্টে রশিদ আহমদ সোনামের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী তৌফিক আনোয়ার চৌধুরী। তিনি বলেন, “দীর্ঘ শুনানি শেষে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ে আমার মক্কেল ন্যায়বিচার পেয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় ৪ বছর ৯ মাস পর শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি তাঁর কাঙ্ক্ষিত দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।”
এছাড়া মৌলভীবাজার আদালতে রশিদ আহমদ সোনামের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন