সিলেট

মৌলভীবাজারে তিনশ বছরের ঐতিহ্যবাহী লাল দুর্গা দেখতে ভিড়

নতুন সিলেট প্রতিবেদক :

নতুন সিলেট প্রতিবেদক :

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩১

মৌলভীবাজারে তিনশ বছরের ঐতিহ্যবাহী লাল দুর্গা দেখতে ভিড়

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে লাল বর্ণের প্রতিমা গড়ে ব্যতিক্রমী আয়োজনে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ পূজা দেখতে লক্ষাধিক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

 

ফলে এটি মৌলভীবাজারের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।

পাঁচগাঁওয়ের এই পূজার বিশেষত্ব শুধু প্রতিমার রঙে নয়, এর পেছনে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য ও জনশ্রুতি।

সাধক সর্বানন্দ দাসের হাত ধরে শুরু হওয়া এই আয়োজন সময়ের পরিক্রমায় পরিণত হয়েছে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় দুর্গোৎসবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাঁচগাঁওয়ের এই ব্যতিক্রমী দুর্গাপূজার ইতিহাস প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো।

১৪১৫ বঙ্গাব্দে নতুন স্থানে মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশের অন্য কোথাও এভাবে লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমার পূজা হয় না বলে স্থানীয়দের দাবি।

ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিনে এখানে লক্ষাধিক ভক্তের সমাগম ঘটে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের পদচারণায় সাধারণত শান্ত থাকা গ্রামটি পরিণত হয় উৎসবমুখর জনপদে। মৃৎশিল্পীরা নিজেদের দক্ষতা ও যত্নে লাল বর্ণের দেবীপ্রতিমা তৈরি করেন। প্রতিমার ব্যতিক্রমী রং ও সাজসজ্জা এই পূজাকে অন্য আয়োজন থেকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।

পাঁচগাঁওয়ে দেবী দুর্গার লাল বর্ণের প্রতিমাকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে একটি অলৌকিক কাহিনি। জনশ্রুতি অনুযায়ী, সাধক সর্বানন্দ দাস আসামের কামাখ্যায় পূজার জন্য একটি শিশুকন্যা লাভ করেন। ধীরে ধীরে শিশুটির শরীর লাল বর্ণ ধারণ করতে শুরু করলে সাধক উপলব্ধি করেন, তার মধ্যে স্বয়ং দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে।

কথিত আছে, দেবী সাধককে বর দিতে চাইলে তিনি রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে দেবীর আবির্ভাব কামনা করেন। তখন দেবী জানান, সেখানে তার প্রতিমার রং হবে লাল। সেই থেকে গ্রামটিতে লাল বর্ণের প্রতিমায় দেবী দুর্গার পূজা হয়ে আসছে।

লোককথায় আরও বলা হয়, একসময় দেবী তার উপস্থিতির নিদর্শন হিসেবে একটি কাঁচা ঘরের বেড়ায় পাঁচ আঙুলের লাল ছাপ রেখে যান। সেই সঙ্গে রেখে যান নিজের স্বর্ণালংকার। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অলংকারগুলো এখনো পূজার সময় দেবীর প্রতিমায় পরানো হয়।

পাঁচগাঁওয়ের দুর্গাপূজা ঘিরে সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত চলে বিশেষ আয়োজন। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, ধূপের সুবাস আর পূজার আনুষ্ঠানিকতায় মণ্ডপজুড়ে তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ। লাল বর্ণের প্রতিমা দেখতে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। অনেকে আসেন মনস্কামনা নিয়ে, কেউ আসেন পরিবারের মঙ্গল কামনায়, আবার কেউ আসেন ঐতিহ্যের টানে।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষাধিক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে এই পূজায়। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ আসেন। ভারত থেকেও ভক্তদের আগমন ঘটে বলে জানান তাঁরা।

পূজার সময় অনেকে দেবীর উদ্দেশে পশুবলি দেন, বস্ত্র ও অলংকার নিবেদন করেন। মনস্কামনা পূরণে কেউ হোমযজ্ঞ করেন, কেউ জ্বালান প্রদীপ ও আগরবাতি। কয়েকটি মহিষ এবং শত শত পাঁঠাসহ হাঁস-কবুতর বলি দেওয়ার কথাও জানান স্থানীয়রা।

পাঁচগাঁও দুর্গাপূজার পরিচালক সঞ্জয় দাস সাধক সর্বানন্দ দাসের ষষ্ঠ উত্তরপুরুষ। তিনি বলেন, তাদের পরিবারে ৩শ বছরের বেশি সময় ধরে লাল বর্ণের প্রতিমায় দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। এটি মূলত পারিবারিক পূজা। দেবীর জাগ্রত উপস্থিতিতে মানুষের বিশ্বাসের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

সঞ্জয় দাস আরও বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একবার পূজার আনুষ্ঠানিকতায় ছেদ পড়ে। সে বছর প্রতিমা পূজার পরিবর্তে ঘটপূজা করা হয়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা নিত্য দাস বলেন, দুর্গোৎসবের দিনগুলোতে এখানে এত মানুষের সমাগম ঘটে যে আগত মানুষের উপস্থিতির দিক থেকে স্থানটি পর্যটনের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। এই উৎসবকে মৌলভীবাজারের পর্যটনের অন্যতম অংশ হিসেবে সুপরিচিত করার সময় এসেছে।

আয়োজকেরা জানান, পূজার দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশীদেরও ব্যস্ত থাকতে হয়। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি বলে জানান তারা। স্থানীয় প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা করে। এবারও স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের প্রশাসনের কর্মকর্তারা খোঁজখবর নিয়েছেন।

পাঁচগাঁওয়ের ব্যতিক্রমী আয়োজনের পাশাপাশি মৌলভীবাজারের অন্যান্য পূজামণ্ডপেও চলছে শারদীয় দুর্গোৎসবের নানা আয়োজন। জেলা শহরের বেশ কয়েকটি মণ্ডপের প্রবেশপথ সাজানো হয়েছে নান্দনিক নকশায়। আলোকসজ্জা ও দৃষ্টিনন্দন সাজে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে।

জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সূত্রে জানা যায়, জেলায় এবার সার্বজনীন ৮৯৮ এবং ব্যক্তিগত ১২৪টিসহ মোট ১ হাজার ২২ পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সদরে ১১১, বড়লেখায় ১৪৬টি, জুড়ীতে ৭৬, কুলাউড়ায় ২২৭, রাজনগরে ১৩৬টি, কমলগঞ্জে ১৫৪টি ও শ্রীমঙ্গলে ১৭২ পূজামণ্ডপে চলছে দুর্গোৎসব।

পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, জেলার সব পূজামণ্ডপে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে পুলিশ ও আনসারের সমন্বয়ে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে।

সিলেট থেকে আরো পড়ুন