ছবি: সংগৃহীত
শিশুদের শরীরে ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ অসুস্থতার মতো মনে হতে পারে। ফলে অভিভাবকদের পক্ষে শুরুতেই রোগটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অকারণে শরীরে কালশিটে দাগ, হাড়ে ব্যথা, অস্বাভাবিক ফোলাভাব কিংবা চোখের মণিতে সাদা প্রতিফলনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি। এসব লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। তবে উপসর্গ স্থায়ী হলে বা বাড়তে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্যানসারের লক্ষণ রোগের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।
শিশুদের ক্যানসার শনাক্ত করা কঠিন কেন?
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যানসারের সঙ্গে শিশুদের ক্যানসারের কিছু পার্থক্য রয়েছে। বড়দের ক্ষেত্রে বয়স, জীবনযাপন ও পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয় ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অন্যদিকে, শিশুদের অধিকাংশ ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না।
এ ছাড়া শিশুরা অনেক সময় তাদের শারীরিক সমস্যার কথা স্পষ্টভাবে বলতে পারে না। ফলে ক্লান্তি, ব্যথা কিংবা শরীরের অন্য কোনো পরিবর্তনকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে উপেক্ষা করতে পারেন অভিভাবকরা।
শিশুদের ক্যানসারের ৭টি সম্ভাব্য লক্ষণ
১. অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
শিশু আগের তুলনায় বেশি ক্লান্ত থাকলে, খেলাধুলায় আগ্রহ হারালে কিংবা ত্বক ও ঠোঁট ফ্যাকাশে হয়ে গেলে বিষয়টি খেয়াল করা প্রয়োজন। লিউকেমিয়া বা রক্তের ক্যানসারে রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া অকারণে শরীরে কালশিটে দাগ, ত্বকে ছোট লালচে বিন্দু কিংবা নাক ও মাড়ি থেকে রক্তপাতও সতর্কসংকেত হতে পারে।
২. কোনো আঘাত ছাড়াই হাড় ও গিঁটে ব্যথা
শিশুদের বেড়ে ওঠার সময় মাঝেমধ্যে পায়ে ব্যথা হতে পারে। তবে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে, ক্রমে বাড়তে থাকলে, রাতে ঘুম ভাঙিয়ে দিলে কিংবা শিশুর হাঁটাচলায় সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কিছু ক্ষেত্রে হাড়ের ক্যানসার বা লিউকেমিয়ার সঙ্গে এ ধরনের উপসর্গের সম্পর্ক থাকতে পারে।
৩. শরীরের কোনো অংশে অস্বাভাবিক ফোলাভাব বা গুটি
শিশুর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাওয়া কিংবা শরীরের কোনো অংশে গুটি দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে পেটে শক্ত চাকা বা গলা, ঘাড় ও বগলে দীর্ঘস্থায়ী গুটি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ উইলমস টিউমার, নিউরোব্লাস্টোমা বা লিম্ফোমার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে সংক্রমণসহ বিভিন্ন সাধারণ কারণেও গুটি বা ফোলাভাব দেখা দেয়।
৪. চোখের মণিতে সাদা প্রতিফলন বা টেরা ভাব
ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তোলার সময় শিশুর চোখের মণিতে স্বাভাবিক লালচে প্রতিফলনের বদলে সাদা আভা দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। চোখে নতুন করে টেরা ভাব দেখা দেওয়া বা দৃষ্টিশক্তিতে পরিবর্তনও সতর্কসংকেত হতে পারে। এসব লক্ষণ রেটিনোব্লাস্টোমা বা চোখের ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এমন পরিবর্তন দেখা গেলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
৫. সকালে মাথাব্যথা ও বমি
শিশুর বারবার মাথাব্যথা হওয়া, বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথাব্যথার সঙ্গে বমি হওয়া, চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি হাঁটার সময় ভারসাম্য হারানো, কথা জড়িয়ে যাওয়া কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। এসব উপসর্গের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে; কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের টিউমারও এর কারণ হতে পারে।
৬. দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, ওজন কমা ও রাতে অতিরিক্ত ঘাম
কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই জ্বর দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, শিশুর ওজন কমতে থাকলে কিংবা রাতে অতিরিক্ত ঘামে পোশাক ভিজে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে এসব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দিলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। কিছু ধরনের ক্যানসার, যেমন লিউকেমিয়া ও লিম্ফোমায় এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে সংক্রমণসহ অন্যান্য রোগেও এসব লক্ষণ হতে পারে।
৭. দীর্ঘস্থায়ী কান থেকে তরল পড়া বা রক্তপাত
শিশুর কান থেকে দীর্ঘদিন ধরে পানি, পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত তরল পড়লে কিংবা এর সঙ্গে রক্ত দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সাধারণ কানের সংক্রমণেও এ ধরনের সমস্যা হতে পারে। তবে চিকিৎসার পরও উপসর্গ না কমলে বা বারবার ফিরে এলে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
শিশুর শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে শুধু ক্যানসারের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন-
* শরীরে অস্বাভাবিক গুটি বা ফোলাভাব দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে কিংবা বাড়তে থাকলে।
* কোনো আঘাত ছাড়াই হাড়ে ব্যথা হলে বা শিশু খুঁড়িয়ে হাঁটলে।
* বারবার জ্বর, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা অকারণে ওজন কমতে থাকলে।
* ত্বকে অস্বাভাবিক কালশিটে দাগ বা বারবার রক্তপাত হলে।
* চোখের মণিতে সাদা প্রতিফলন বা নতুন করে টেরা ভাব দেখা দিলে।
* সকালে মাথাব্যথার সঙ্গে বারবার বমি হলে।
শিশুর হঠাৎ খিঁচুনি, শরীরের একপাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, চেতনা কমে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই জরুরি
শিশুদের শরীরে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। অনেক সাধারণ রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে কোনো লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকলে তা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
অভিভাবকদের সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা রোগ শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করে উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করা গেলে অনেক শিশুর সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ থাকে। তাই ভয় নয়, সন্তানের শারীরিক পরিবর্তনের প্রতি সচেতন থাকুন।
লাইফস্টাইল থেকে আরো পড়ুন