প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫:২২
কাল্পনিক ছবি:
শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক খেলে হাঁপানি থেকে যৌনক্ষমতা নানা রোগের চিকিৎসা হয়, আবার জোঁকের তেল নাকি সারিয়ে দেয় বাত-ব্যথা ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে এমন নানা লোকবিশ্বাস। তবে এসব দাবির পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিয়ালের মাংস কিংবা তক্ষকের কথিত ঔষধি গুণের পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং এসব গুজব ও লোকবিশ্বাসের কারণে বন্যপ্রাণী নিধন এবং পাচারের ঝুঁকি বাড়ছে।
শিয়ালের মাংসে কি সত্যিই রোগ সারে?
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় শিয়ালকে অশুভ ও ক্ষতিকর প্রাণী হিসেবে মনে করার পাশাপাশি এর মাংসের কথিত ঔষধি গুণ নিয়েও নানা বিশ্বাস রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, শিয়ালের মাংস খেলে হাঁপানি, বাতসহ দীর্ঘস্থায়ী বিভিন্ন রোগ ভালো হয়।
সম্প্রতি বরিশালে সাতটি শিয়াল পিটিয়ে হত্যার ঘটনাতেও শিয়ালের মাংস খাওয়ার এমন লোকবিশ্বাসের কথা উঠে আসে।
তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলছেন, শিয়ালের মাংসে কোনো ঔষধি গুণ নেই। এটি মূলত ভ্রান্ত ধারণা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও জানান, শিয়ালের মাংস রোগ সারায় এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আধুনিক ফার্মাকোলজিতেও এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিয়ালকে ঘিরে প্রচলিত এসব ধারণা মূলত লোকবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে এসেছে।
তক্ষক নিয়ে কোটি টাকার গুজব
বাংলাদেশে তক্ষককে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে কোটি টাকার নানা গল্প ও প্রতারণার ঘটনা সামনে এসেছে। ক্যানসারসহ দুরারোগ্য ব্যাধি সারানো কিংবা যৌনক্ষমতা বাড়ানোর মতো কথিত গুণের কথা বলে তক্ষকের দাম কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত দাবি করার ঘটনাও ঘটেছে।
এমনকি কথিত ক্রেতাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কিন্তু তক্ষকের এসব কথিত ঔষধি গুণ কিংবা কোটি টাকার বৈধ বাজারমূল্যের কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এসব গুজবকে কেন্দ্র করে তক্ষক ধরার প্রবণতা বেড়েছে এবং পাচারের ঘটনাও ঘটেছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, তক্ষককে ঘিরে একটি প্রতারণার চক্র তৈরি হয়েছে। আগে মানুষ বেশি তক্ষক ধরলেও বর্তমানে এ প্রবণতা কিছুটা কমেছে।
জোঁকের তেল আর লিচ থেরাপি এক নয়
জোঁক দিয়ে চিকিৎসার ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতিতে জীবন্ত জোঁক ব্যবহার করে চিকিৎসার কথা পাওয়া যায়। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থাতেও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিতভাবে মেডিকেল লিচ বা জোঁক ব্যবহারের চিকিৎসাপদ্ধতি রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিচ থেরাপি আর বাজারে বিক্রি হওয়া তথাকথিত ‘জোঁকের তেল’ এক বিষয় নয়।
হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের আয়ুর্বেদিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদের মতে, নির্দিষ্ট প্রজাতির ‘মেডিকেটেড’ জোঁক ব্যবহার করে কিছু ক্ষেত্রে লিচ থেরাপি দেওয়া হয়। তবে বাজারে প্রচলিত জোঁকের তেল বাত, ব্যথা কিংবা যৌনসমস্যা সারায় এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও বলেন, জোঁকের তেলের ঔষধি গুণের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
অর্থাৎ, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রিত লিচ থেরাপির ব্যবহার থাকলেও, সেটিকে জোঁকের তেল বিক্রির নানা দাবির সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, অজানা উৎসের প্রাণীর মাংস বা দেহজাত উপাদান খাওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে। বিশেষ করে বন্যপ্রাণীর দেহে থাকা জীবাণু, পরজীবী বা অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
ফলে রোগ সারানোর আশায় এসব উপাদান ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
আইনেও নিষিদ্ধ শিয়াল ও তক্ষক শিকার
বাংলাদেশের ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা), ২০২৬’ আইনে খেঁকশিয়াল, পাতিশিয়াল ও তক্ষককে সংরক্ষিত প্রাণী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, গবেষণা বা বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন ছাড়া কিংবা প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা পজেশন সার্টিফিকেট না থাকলে এসব প্রাণী শিকার, উত্যক্ত, পরিবহন, ক্রয়-বিক্রয় কিংবা আমদানি-রপ্তানি করা যাবে না।
বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস জানান, শিয়াল ও তক্ষক নিয়ে দেশে নানা কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। তবে তক্ষকের কথিত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যেরও কোনো ভিত্তি নেই।
আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বন বিভাগ, পুলিশ, কাস্টমস, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড সংশ্লিষ্ট বন্যপ্রাণী বা আলামত জব্দ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
সংরক্ষণে বাড়ছে উদ্বেগ
আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে খেঁকশিয়ালকে ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ এবং তক্ষককে ‘লিস্ট কনসার্ন’ বা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।
২০২৬ সালের মূল্যায়নেও তক্ষক ‘লিস্ট কনসার্ন’ অবস্থানে রয়েছে। তবে আইইউসিএন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সারোয়ার আলমের মতে, বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো তক্ষককে বাণিজ্যিকভাবে প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
অর্থাৎ, একটি প্রাণী আন্তর্জাতিকভাবে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে না থাকলেও স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত শিকার ও বাণিজ্যের কারণে তার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, শিয়ালের মাংস, তক্ষক কিংবা জোঁকের তেলকে ঘিরে প্রচলিত অধিকাংশ রোগ নিরাময়ের দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এসব লোকবিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। একই সঙ্গে কুসংস্কারের কারণে বন্যপ্রাণী নিধন বন্ধ করাও জরুরি।
লাইফস্টাইল থেকে আরো পড়ুন