বিদেশ থেকে টাকা পাঠানোর জন্য নিজের নামে অ্যাকাউন্ট করে সৌদি আরবে চলে যান স্ত্রী ফাতেমা বেগম। এ কারণে স্ত্রীর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে তিন শিশুকে কীটনাশক পান করিয়ে নিজেও কীটনাশক পান করেন সরাফত আলী (৩৮)।
এতে তিন সন্তানের মৃত্যু হলেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি।
সরাফত আলীর স্বজন ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
বর্তমানে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশি নজরদারিতে তার চিকিৎসা চলছে সরাফত আলীর।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিনগত রাত ২টার দিকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের রজনীলাইন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত শিশুরা হলো- সরাফত আলীর মেয়ে মাওয়া আক্তার (১০), ছেলে শামিম মিয়া (৭) ও তামিম মিয়া (২)।
নিহত শিশুদের চাচা রহমত আলী ওরফে রহম আলী ও স্বজনদের বরাত দিয়ে তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমদ বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য থেকে নির্মম এ ঘটনাটি ঘটেছে।
তিনি বলেন, সরাফত আলী কৃষিকাজ করতেন। পাশাপাশি হাওরে মাছ ধরেও জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাদের ঔরসজাত তিন সন্তান। সংসারে অভাবের তাড়নায় সৌদি পাড়ি দেন তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম। তিন বছর সেখানে থেকে উপার্জন করে টাকা পাঠালে তা খরচ করে ফেলেন তার স্বামী। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হতে থাকে। তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম ছুটি কাটিয়ে গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আবারও সৌদি চলে যান। যাওয়ার আগে সন্তানদের ভবিষ্যতের চিন্তা করে নিজের নামে একটি আলাদা ব্যাংক হিসাব খুলে যান। এ কারণে মানসিক বিকারগ্রস্ততা পেয়ে বসে সরাফত আলীকে। তিনি শিশুদের কীটনাশক পান করিয়ে নিজেও কীটনাশক পান করেন।
এদিকে বাড়ির লোকজন গভীর ঘুমে থাকায় তখনো ঘটনাটি জানতেন না বলে জানান, সরাফত আলীর ভাই রহমত আলী।
পুলিশকে তিনি জানান, শিশুদের কীটনাশক পান করানোর পর বিষপানের আগে ভাই সরাফত আলী ময়মনসিংহে থাকা তার ফুফুকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান এবং কোনো দাবি না রাখতে বলেন। পরে ফুফু ফোন করে ঘটনাটি জানাতেই স্বজনরা দ্রুত সরাফত আলীর ঘরের দরজা ভেঙে তিন শিশুকে মুমূর্ষ অবস্থায় দেখতে পান। তখন ভাই সরাফত আলীও কীটনাশক পান করে চটফট করছিলেন। তাদের উদ্ধার করে উপজেলার বাদাঘাট হাফিজ উদ্দিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তিন শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকের পরামর্শে সরাফত আলীকে শনিবার সকালে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে পুলিশি নজরদাতে তার চিকিৎসা চলছে।
ঘটনাটি জানতে পেরে রাতেই বাদাঘাট ফাঁড়ি পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে তিন শিশুর লাশ উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাসাদ আহমেদ বলেন, সকাল ৮টার দিকে তিন শিশুকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাদের বিষপান করানো হয়েছে। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।
শনিবার সকালে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও থানার ওসি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সে সময় তারা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। স্বজন ও এলাকাবাসী পুলিশের কাছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্যের কথা জানান। তারা জানান, সৌদিতে থাকা সরাফত আলীর স্ত্রী তার কষ্টের উপার্জিত টাকা পাঠালে সেই টাকা খরচ করে ফেলতেন সরাফত। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়। সরাফত আলীকে তার স্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, আর কোনো টাকা দেবেন না। কেবল সন্তানদের প্রয়োজনীয় খরচ দেবেন। যে কারণে পৃথক ব্যাংক হিসাব খুলে যাওয়ায় মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। সে কারণে সন্তানদের কীটনাশক পান করিয়ে নিজেও আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
ওসি ফারুক আহমদ আরও বলেন, তিন শিশুর লাশ সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন