সিলেট

সুনামগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে ফাটল, ২ ভাই মুখোমুখি

নতুন সিলেট ডেস্ক:

নতুন সিলেট ডেস্ক:

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ ১৩:৫৩

সুনামগঞ্জে বিএনপির রাজনীতিতে ফাটল, ২ ভাই মুখোমুখি

ছবি: সংগৃহীত

সুনামগঞ্জ -২ আসন(দিরাই, শাল্লা) বিএনপির রাজনীতিতে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। বর্তমান রাজনীতিতে গ্রুপিং দিরাই ও শাল্লা উপজেলার বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমান সাংসদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলয়ে একটি গ্রুপ।

অন্যদিকে অপর পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন এমপি নাছির চৌধুরীর ছোট ভাই এবং উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক (স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত) মঈন উদ্দিন চৌধুরী (মাসুক চৌধুরী)।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বেও দিরাইয়ে বিএনপি চার ভাগে বিভক্ত ছিল। তৎকালীন মনোনয়নপ্রত্যাশী চার গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন—বর্তমান সংসদ সদস্য নাছির চৌধুরী, তার ছোট ভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী (মাসুক চৌধুরী), সাবেক বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী রুমি এবং অ্যাডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল। পরবর্তীতে কেন্দ্র থেকে নাছির চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেলকে যৌথভাবে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়। তবে হাইকমান্ডের নির্দেশে পাবেল প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নিলে নাছির চৌধুরী একক প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।

এর আগে মাসুক চৌধুরী তাঁর বড় ভাই নাসির চৌধুরী বলয়ে রাজনীতি করলেও বর্তমান তিনি নিজের অনুসারী কর্মী তৈরি করে নেতৃত্ব দিতে বিশাল সমাবেশের ডাক দিয়েছেন। এছাড়াও রয়েছে তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল বলয়ে রাজনীতি করা আরেকটি গ্রুপ। গত ৬ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) দিরাইয়ে জুলাই স্মরণ সমাবেশ করেন নাসির চৌধুরী বলয়ের নেতাকর্মীরা। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে নাসির চৌধুরী বলেন, আজকের এই সমাবেশই বিএনপির মূল সমাবেশ। এর বাইরে বিএনপির আর কোনো সমাবেশ নেই। আগামী ৮ আগস্ট বিএনপির নামে যারা আলাদা সমাবেশ করতে চাচ্ছে, তারা মূলত দলে বিভক্তি সৃষ্টি করতে চায়। এদের সম্পর্কে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

নাসির চৌধুরীর দেয়া এমন বক্তব্য বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে মাসুক চৌধুরী ও তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল একত্রে হয়ে আজ শনিবার (৮ আগস্ট) বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে এমপি বলয়ের নেতাকর্মীরা এই সমাবেশ বানচালের জন্য নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে জনগনের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। মাসুক বলয়ের নেতাকর্মীদের দাবী, প্রকৃত বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত হাজার হাজার নেতাকর্মীদের কোনঠাসা করে আওয়ামীলীগের আমলে সুবিধা পাওয়া লোকজনদেরকে আশ্রয় দিয়েছে। বর্তমানে দিরাই শাল্লার রাজনীতিতে বিনপির বদলে আওয়ামীলীগের নামধারীদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে এমপি বলয়ের গ্রুপকে চাঙ্গা করে তুলছে। তাই দিরাই শাল্লার জনগন ও বিএনপির ত্যাগী নেতারা এখন ওদের আসল রুপ চিনতে পেরে সকল বিএনপি নেতারা তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল ও মাসুক চৌধুরী বলয়ে আসতে শুরু করেছে। তাই সকল বাঁধা উপেক্ষা করে আজকের সমাবেশের মাধ্যমেই জানান দেয়া হবে বিএনপি এখনো দিরাই শাল্লায় রয়েছে। কারো পারিবারিকতন্ত্রে বিএনপি দাসত্ব করতে চায় না।

স্থানীয়দের একাংশের দাবি, নাছির চৌধুরী এমপি হওয়ার পর তার প্রভাব ও এলাকা পরিচালনায় ছায়া সঙ্গী কে হবেন, তা নিয়েই দ্বন্দের সূচনা। অসুস্থতার সুযোগে পুরো নিয়ন্ত্রণ এমপির স্ত্রী পারভিন আক্তারের হাতে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেখানে তাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন আহ্বায়ক আমির হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির।

জুলাই মাসের শুরুতে এমপি নাছির চৌধুরীর মৃত্যু নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজব বা অপপ্রচারের প্রতিবাদে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন আমির হোসেন ও হুমায়ুন কবির। ওই সংবাদ সম্মেলনে মাসুক চৌধুরীসহ তার অনুসারীদের আমন্ত্রিত না করায় কোন্দল চরম আকার ধারণ করে। এরপর থেকেই দুই পক্ষ আলাদা ব্যানার ও কর্মসূচিতে রাজপথে নামছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা বিএনপির এক সদস্য বলেন, এমপি নাছির চৌধুরী একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তবে নির্বাচনের পর সরকারি অনুদান ও উন্নয়ন বরাদ্দ বণ্টনকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেটের সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তার তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগে পৌর সদরে বিক্ষোভ মিছিল হওয়ায় দলের ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষুণ্ন হয়েছে।

কোন্দলের ধারাবাহিকতায় গত ১৬ জুলাই উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুক চৌধুরী, পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান এবং সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে দলীয় কার্যালয়ে পৃথক যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির তালুকদারকে দল থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটিতে চিঠি পাঠানো হয়। এর জবাবে গত বৃহস্পতিবার শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে মাসুক চৌধুরীর অনুসারীদের বাদ দিয়েই ‘সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা’ ব্যানারে পাল্টা আলোচনা সভা করে এমপিপন্থী অংশটি।

দিরাই পৌর বিএনপির সদস্য সচিব ইকবাল চৌধুরী বলেন, এমপি মহোদয় আমাদের অভিভাবক, আমরা তার বিরোধী নই। কিন্তু পৌর বিএনপিকে অন্ধকারে রেখে কিছু সুবিধাভোগী লোক সরকারি সহায়তা বিতরণ করেছে। আহ্বায়ক গত ছয় মাস ধরে দলের কোনো আনুষ্ঠানিক সভা ডাকেন না। অনিয়মের কারণে দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

এ বিষয়ে এমপির ছোট ভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী (মাসুক চৌধুরী) বলেন, দায়িত্বশীলদের না জানিয়ে সভা করা গঠনতন্ত্রবিরোধী। এ কারণেই অনিয়মে জড়িতদের অব্যাহতির সুপারিশ জেলায় পাঠানো হয়েছে। আমার ভাবিকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। তারা আওয়ামী লীগ ঘরানার লোকদের প্রাধান্য দিয়ে আমাদের মতো ত্যাগীদের কোণঠাসা করছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড বিতরণে ব্যাপক দুর্নীতি হওয়ায় আমরা নেতাকর্মীদের স্বার্থেই প্রতিবাদ করছি।

অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে দিরাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আমির হোসেন বলেন, আমরা কোনো বরাদ্দ বণ্টন করি না; এমপি সাহেবই সব সিদ্ধান্ত নেন। মাসুক চৌধুরী ও তার সঙ্গীরাই দলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। জরুরি প্রয়োজনে সংবাদ সম্মেলন করায় সেদিন তাদের পাওয়া যায়নি। আমরাও মাসুক চৌধুরীকে দল থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ জেলা কমিটিতে পাঠাচ্ছি।

সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত সদস্য (সদস্য সচিব) অ্যাডভোকেট আব্দুল হক বলেন, দিরাই বিএনপির কাউকে অব্যাহতির আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি এখনো জেলা কমিটি পায়নি। পাল্টাপাল্টি সভার কথা শুনলেও খুব দ্রুত আলোচনা করে এই স্থানীয় কোন্দল নিরসন করা হবে।

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল বলেন, এমপি মহোদয়ের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী লোক নিজেদের ফায়দা লুটতে সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। আশা করি কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে এই বিভক্তি দ্রুত দূর হবে।

এমপির স্ত্রী পারভিন আক্তার বলেন, মাসুক একজন চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ব্যক্তি। অতীতেও সে পরিবারের ভেতরে নানা ঝামেলা করেছে। আমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করি—এই তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা। তবে নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেই অনুযায়ী অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে কাজ করছি। খাদ্য গুদাম, ইইউএনও বা থানা কেন্দ্রিক দুর্নীতি বন্ধ হওয়ায় কিছু লোক আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছে।

সিলেট থেকে আরো পড়ুন