সপ্তম রায় প্রীতমের এই ছবিটি এখন কেবলই স্মৃতি।
বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে ছিল সপ্তম রায় প্রীতম। মাত্র ২২ বছর বয়সে জীবনাবাসন হলো তার। উপার্জনক্ষম ছেলেটিকে হারিয়ে ব্যাকুল বাবা উত্তম রায়। বিলাপ করে বললেন, ” আমরা কি নিয়ে বাঁচবো। ছেলেটি (উত্তম) ছিল ছিল আমাদের পৃথিবী।
সিলেটে একটি দোকানে চাকরী করতেন প্রীতম। বৃহস্পতিবার (০৭ আগস্ট) সকালে ইউনিক পরিবহণে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন তিনি। চাকরীর সুবাদে তার ঢাকায় যাওয়া। কিন্তু পথিমধ্যে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন প্রীতম। হাসপাতালে আনার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সিলেট নগরীর সোবহানীঘাট এলাকার ভাড়াটিয়া বাসার বাসিন্দা উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম (২২), তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জে। তার মৃত্যুর পর চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বৃদ্ধ মা ও বোনের পরিবার।
স্বজনরা জানান, প্রীতমের একমাত্র ভাই ছোটবেলায় পানিতে ডুবে মারা যায়। বাবা-মা একমাত্র সন্তানকে আকড়ে ধরে বেঁচেছিলেন। সংসারের সব দায়িত্বও প্রীতমের কাঁধে। সীমাহীন অভাব-অনটনের মধ্যেও বাবা-মা ও বোনের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
নিহত প্রীতমের খালাতো ভগ্নিপতি কাজল ভৌমিক বলেন, প্রীতমের আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলতো পুরো পরিবার। তাকে হারিয়ে বৃদ্ধ মা ও বোন সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়েছেন। শোকের সাগরে ভাসা পরিবারটির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে।
নিহত প্রীতমের খালাতো বোন হৈমন্তী রায় বলেন, ”প্রীতম আমার খালাতো ভাই। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সে। সেই ওই পরিবারের আয় রোজগারের একমাত্র ভরসা ছিল। খুবই শান্ত স্বভাবের ছিল প্রীতম। সে ঢাকায যাওয়ার পথে ইউনিক পরিবহণে ছিল। গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনার পর কেউ একজন তার মোবাইল থেকে ফোন দিয়ে বলে, ওই মোবাইলের মালিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, একেবারে মারা গেছে? হ্যাঁ। এ কথা শোনার পর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। তার বাবা-মাকে কিভাবে ঘটনাটি জানাই, অসহায় চাহনী ও চোখে ছলছল জল নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় বিমর্ষ অবস্থায় বসেছিলেন তিনি।
ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওমর রাশেদ মবিন বলেন, ”আমরা হাসপাতালে ১৬ জন রোগী পেয়েছি। তার মধ্যে এক শিশু ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আর প্রীতম নামের এক যুবক হাসপাতালে আনার পর মৃত্যু হয়। বর্তমানে হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিটে ১৪ জনের চিকিৎসা চলছে। তাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৭টায় সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ঢাকাগামী ইউনিক বাস ও বিপরীতগামী বেঙ্গল পরিবহণ ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। এতে ইউনিক পরিবহণের ৮ যাত্রী ঘটনাস্থলে প্রাণ হারায়। হাসপাতালে আনার পর প্রীতম মারা যান।
নিহতরা হলেন, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত সাফিউদ্দিনের ছেলে হাজি সাইফুল ইসলাম (৫০), সিলেট নগরীর দক্ষিণ সুরমা থানার চণ্ডীপুল এলাকার জাহাঙ্গীরের মেয়ে, তিন বছর বয়সী শিশু ফাইজা, সিলেটের সোবহানীঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম (২২), কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার চণ্ডিবের গ্রামের বাবুল মিয়ার মেয়ে, বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী (১৭), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার বগডহর গ্রামের মৃত বারেক মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন (৪৪), সিলেটের জৈন্তাপুর থানার উমনপুর গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে আরমান (১৯), কুমিল্লার বাঙ্গুরা বাজার থানার পীরকাশিমপুর গ্রামের আব্দুস সালামের ছেলে সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯), ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার শেরপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ইমন, এবং কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার ষাইধার (আটরামপুর) গ্রামের রঞ্জিত সূত্রধরের ছেলে রুবেল সূত্রধর (৩৭)।
এ ছাড়া দুই বাসের অন্তত ২৪ জন যাত্রী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪ জন বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতরা ১৪ জন হলেন- ওয়াহাব (৪৫), ঢাকার মনসুর আলী (৩৪), ব্রাম্মণবাড়িয়ার আতিকুল ইসলাম (৪৮),কিশোরগঞ্জের বাবুল (৪০), ব্রাম্মণবাড়িয়ার মফিজ মিয়া (৫৫), সাজিদ নুর (৪৫), নুরুন্নাহার (৪০), মুক্তার হোসেন (২৯), জাহাঙ্গীর (২৮), আফজল(৩০), আফরোজা (৩৮), মন্টু (৩০),সুমানগঞ্জের রাজু দাস (৩৫)।
আহত অন্যরা হলেন- কিশোরগঞ্জের ফারুক আহমদ (৫০), ফরিদপুরের শামীম আহমদ (৫০), ঢাকার মঞ্জু দাস (৫০), কুমিল্লার ইমরান (৩৫) গুরুতর আহত হয়ে অন্য হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন