প্রভাব, নাকি প্রমাণের অভাব?
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ ১০:৫৫
সিলেটের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে প্রকাশ্যে দুই শ্রমিক হত্যা মামলার প্রধান আসামিসহ চারজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পুলিশ। মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই এই সুপারিশ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ৬ মে খুনের ঘটনায় নিহত বাস হেলপার রিপন আহমদের বাবা ছাবলু মিয়া ও নিহত দেলওয়ার হোসেনের বাবা আজির উদ্দিন পৃথক দুটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
রিপন হত্যা মামলায় সিলেট জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে ২৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ছয়জনকে গ্রেফতার করলেও মামলার প্রধান আসামি হিসেবে অভিযুক্ত শ্রমিক নেতা ময়নুল ইসলাম ও আলী আকবর রাজনসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
এ নিয়ে নিহতদের স্বজন, শ্রমিকদের একটি অংশের মধ্যেও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আসামি হয়েও কমিশনার কার্যালয়ের সভায় তাদের দাওয়াত ও উপস্থিতি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ৫ জুলাই সিলেট মহানগর পুলিশের (এসএমপি) তৎকালীন কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত যানজট নিরসনবিষয়ক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন হত্যা মামলার প্রধান আসামি ময়নুল ইসলাম ও আলী আকবর রাজন। জামিন না নিয়েই হত্যা মামলার আসামিদের এমন সরকারি সভায় অংশগ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে পুলিশ পদক্ষেপ নিতে চায়না। কেননা, সুনির্দিষ্ট মামলায় কোনো শ্রমিক নেতাকে গ্রেফতার করলে আসামিকে ছাড়িয়ে নিতে সড়ক অবরোধ করে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরী করা হয়। বিগত দিনেও এমন পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল। ফলে শ্রমিকদের প্রভাবের বিরুদ্ধে সহসাই পদক্ষেপে যায় না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শ্রমিক সংগঠনের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, পুলিশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় অভিযুক্ত কয়েকজন শুরু থেকেই সুবিধা পাচ্ছেন।
তাদের ভাষ্য, সেই প্রভাবের কারণেই তারা এখন পর্যন্ত গ্রেফতার এড়িয়েছেন এবং মামলার তদন্তেও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। ফলে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
গত ১০ জুন দক্ষিণ সুরমা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মফিজুর রহমান ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩এ ধারায় আদালতে একটি অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
প্রতিবেদনে মামলার প্রধান আসামি শ্রমিক সংগঠনের জেলা সভাপতি ময়নুল ইসলাম, দ্বিতীয় আসামি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজন, ষষ্ঠ আসামি আব্দুস শহিদ এবং সপ্তম আসামি সামসুল হক মানিককে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনটি অগ্রবর্তী করেন দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফ উজ্জামান।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মফিজুর রহমান নতুন সিলেটকে বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট চারজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তারা পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিতভাবে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। কমিশনারের নির্দেশে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়টি বাদিকেও অবহিত করা হয়েছে, দাবি করেন তিনি।
তবে তারা ঘটনাস্থলে না থাকলেও হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ছিলেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নয়। পূর্ণাঙ্গ তদন্তে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধেও চার্জশিট দেওয়া হবে।
দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফ উজ্জামান নতুন সিলেটকে বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩এ ধারায় প্রাথমিকভাবে অব্যাহতির সুপারিশ করার সুযোগ রয়েছে। পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। মামলায় এ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ডিসি কোর্টের নেতৃত্বাধীন যাচাই-বাছাই কমিটিও সুপারিশটি অনুমোদন করেছে।
তবে অভিযোগের ফলাফল বাদি ছাবুল মিয়া জানেন কিনা, এ বিষয়ে ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে, বাস চালক দেলওয়ার হোসেন হত্যা মামলার বাদী নিহতের পিতা আজির উদ্দিন পরবর্তীতে আদালতে হলফনামা দিয়ে জানান, মামলায় ভুল ব্যক্তিদের তিনি আসামি করেছেন। এরপর নিহত দেলওয়ারের স্ত্রী রাজিয়া আক্তার প্রকৃত আসামিদের নাম উল্লেখ করে আদালতে দরখাস্ত মামলা (নং-১৪৫/২৬) দায়ের করেন।
গত ২৭ এপ্রিল সিলেট-জগন্নাথপুর রুটের বাস মালিক সমিতির আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। মালিক সমিতির বিরোধে হলেও তাতে শ্রমিক নেতারা একটি পক্ষ নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান। ওইদিন দুপুরের দিকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ভাঙচুর করা হয় বাস ও টিকিট কাউন্টার। বেধড়ক মারধরে গুরুতর আহত হন অন্তত সাত শ্রমিক। আহতদের মধ্যে বাস হেলপার রিপন আহমদ ও চালক দেলওয়ার হোসেনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যান। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন