সিলেট

গোয়াইনঘাটে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তিন বন্ধুর মৃত্যু: জানাজায় অশ্রুসিক্ত

নতুন সিলেট প্রতিবেদক:

নতুন সিলেট প্রতিবেদক:

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ ১৮:০১

গোয়াইনঘাটে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তিন বন্ধুর মৃত্যু: জানাজায় অশ্রুসিক্ত

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার মধ্য জাফলং ইউনিয়নে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সংঘটিত মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শেষ পর্যন্ত তিন স্কুলছাত্রেরই মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা সবাই উপজেলার জাফলং আমির মিয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো জাফলং আমির মিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন শিক্ষার্থী সাকিব আহমদ, রায়হান আহমেদ (রাহুল) ও জয় আহমদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। একসঙ্গে বেড়ে ওঠা এবং স্বপ্ন বুকে নিয়ে পথচলা তিন বন্ধুর একসঙ্গে বিদায় নেওয়ায় পুরো গোয়াইনঘাট উপজেলাকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

সোমবার (৬ জুলাই) নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। উঠোনজুড়ে স্বজনদের কান্না আর ঘরের ভেতরে সন্তানহারা মায়েদের আহাজারিতে যেন বাতাসও ভারী হয়ে উঠেছে।

নিহতরা হলেন- উপজেলার নয়াবস্তি গ্রামের মহরম মিয়ার ছেলে সাকিব আহমদ (১৬), ছৈলাখেল গ্রামের হাবিবুর রহমান (হবি) মিয়ার ছেলে রায়হান আহমেদ (রাহুল) (১৬) এবং লাখেরপাড় গ্রামের রাজ্জাক মিয়ার ছেলে জয় আহমদ (১৬)।

রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে উপজেলার মধ্য জাফলং ইউনিয়নের রাধানগর-বাউরভাগ চা বাগান সড়কে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা দিলে তিনজন গুরুতর আহত হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে তিন শিক্ষার্থীরই মৃত্যু হয়।

নিহত সাকিব আহমদের জানাজা রবিবার বাদ মাগরিব জাফলং আমির মিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। পরে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

এদিকে সোমবার সকালে ছৈলাখেল অষ্টম খণ্ড কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে রায়হান আহমেদের জানাজা শেষে তাকে সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। একই দিন বাদ জোহর লাখেরপাড় গ্রামের হামিদ আলী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে জয় আহমদকে দাফন করা হয়।

পারিবারিক সূত্রে জানায়, হাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে তিন বন্ধুর মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। স্কুল, খেলাধুলা কিংবা অবসর-সবখানেই তারা ছিলেন একে অপরের সঙ্গী। কয়েক ঘণ্টা আগেও তারা একসঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছে, হাসি-আড্ডা দিয়েছে; আর এখন তারা কবরের বাসিন্দা।

নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। উঠোনজুড়ে স্বজনদের কান্না আর ঘরের ভেতরে সন্তানহারা মায়েদের আহাজারিতে যেন বাতাসও ভারী হয়ে উঠেছে। কেউ ছেলের স্কুলব্যাগ বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন, কেউ বারবার ছেলের নাম ধরে ডাকছেন- ‘‘একবার ফিরে আয় বাবা, আরেকবার মাকে ডেকে যা।’’

এক মায়ের আর্তনাদ, সকালে হাসিমুখে পরীক্ষা দিতে গেল, সন্ধ্যায় আমার বুক খালি করে চলে এলো। আরেক মা ছেলের ছবি বুকে চেপে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

নিহত সাকিবের বাবা মহরম মিয়া বলেন, ‘‘আমার ছেলে খুব শান্ত-স্বভাবের ছিল। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। আল্লাহ আমার বুকটাই খালি করে দিলেন।’’

রায়হানের বাবা হাবিবুর রহমান (হবি) মিয়া বলেন, ‘‘ছেলেটা সবার সঙ্গে হাসিখুশি থাকত। সকালে বের হয়েছিল, আর লাশ হয়ে ফিরবে-এটা কোনো বাবা মেনে নিতে পারে না।’’

জয়ের বাবা রাজ্জাক মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘‘তিন বন্ধু একসঙ্গে চলাফেরা করত, আল্লাহ তাদের একসঙ্গেই নিয়ে গেলেন। তাদের জন্য সবাই দোয়া করবেন।’’

তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে জাফলং আমির মিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রতিনিধিরা এ ঘটনাকে অপূরণীয় ক্ষতি বলে উল্লেখ করেছেন। সহপাঠীদের মধ্যে নূর হোসেনসহ অনেকেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছে, উঠতি বয়সি তিন বন্ধু এভাবে চলে যাবে, আমরা কখনো ভাবিনি।

এদিকে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গোয়াইনঘাট অঞ্চলে প্রায়ই কিশোরদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালাতে দেখা যায়, যা প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী এ ঘটনাকে অপূরণীয় ক্ষতি আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘‘এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো, লাইসেন্সবিহীন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরা যাতে মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সিলেট থেকে আরো পড়ুন