প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:২৫
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য দেখে আমি অনেকটাই হতাশ। দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি হওয়া উচিত দায়িত্ব, নীতি ও জনকল্যাণের বিষয়। কিন্তু বাস্তবতার কিছু চিত্র দেখে সত্যিই হতাশ হতে হয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। পরবর্তীতে সামরিক শাসনের মাধ্যমে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালিত হয় এবং এরশাদ সরকারের সময়ও সামরিক আইনের প্রভাব দেশের রাজনীতিতে ছিল।
এরপর ১৯৯১ সাল থেকে দেশে আবার গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি আশা করেছিলাম, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে এবং জনগণ একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ পাবে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে বিভাজন ও বৈষম্যের অভিযোগ ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার সরকার গঠনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভাজন আরও গভীর হয়েছে বলে আমি মনে করি। এক পক্ষকে স্বাধীনতার পক্ষ এবং অন্য পক্ষকে স্বাধীনতার বিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করার রাজনৈতিক প্রবণতা জাতিকে আরও বিভক্ত করেছে—এমনটাই আমার উপলব্ধি।
পরবর্তীতে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়েও দেশে ব্যাপক বিতর্ক ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আমার বিবেচনায়, দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আমি মনে করি।
এই পরিস্থিতি থেকে পরিবর্তনের দাবিতে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন একপর্যায়ে ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র-শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
তখন আমি আবার আশাবাদী হয়েছিলাম যে, এবার বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে একটি অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়েও আমার কিছু প্রশ্ন ও হতাশা রয়েছে। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতি, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, যুবসমাজ এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আমার উদ্বেগ রয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়েও আমার সমালোচনা রয়েছে। আমি মনে করি, এসব বিষয়ে জনগণের সামনে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
আমার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বাংলাদেশের যুবসমাজকে নিয়ে। দেশের ভবিষ্যৎ মূলত তরুণ প্রজন্মের ওপর নির্ভরশীল। তাই তরুণদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না করে তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দক্ষতা অর্জন এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমার একটি বিশেষ আহ্বান রয়েছে।
বাংলাদেশ কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়। বাংলাদেশ শুধু বিএনপির নয়, আওয়ামী লীগের নয়, কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলেরও নয়। বাংলাদেশ এ দেশের আপামর জনগণের।
যেসব রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আমাদের একসঙ্গে বসে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি কঠিন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট থেকে দেশকে উত্তরণ করতে হলে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একার পক্ষে তা সম্ভব নয়। প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংলাপ।
তাই আমি বর্তমান সরকারপ্রধানের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি—বাংলাদেশের সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সর্বদলীয় আলোচনা সভার আয়োজন করা হোক।
একই সঙ্গে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক, সমাজবিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞদেরও এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত নিয়ে একটি পরামর্শক কাঠামো গঠন করা হলে দেশের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে আরও বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা সম্ভব হবে।
আমাদের সামনে বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যা, সার ও কৃষি উপকরণের সংকট, কর্মসংস্থানের অভাবসহ নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে শুধু সরকারের একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনা করা হলে তা জাতীয় স্বার্থে সহায়ক হতে পারে।
আমি বিশ্বাস করি, পারস্পরিক রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও জাতীয় স্বার্থে সংলাপের দরজা খোলা রাখা প্রয়োজন। মতের পার্থক্য থাকবে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমাদের একসঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।
আগামী পাঁচ বছর যে সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকুক, তাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের সেবা করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, দুর্নীতি কমানো, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া।
আমি আশা করি, বর্তমান সরকার সব রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
আহমদ আলী মাস্টার
প্রাক্তন শিক্ষক, ফতেপুর প্রথম উচ্চ বিদ্যালয়, নওগাঁ সদর, নওগাঁ।
শিল্প সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন