ধর্ম

হিল্লা বিয়ে কী ? ইসলামে হিল্লা বিয়ের বিধান সম্পর্কে যা বলা হয়েছে

ধর্ম ডেস্ক:

ধর্ম ডেস্ক:

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:২৭

হিল্লা বিয়ে কী ? ইসলামে হিল্লা বিয়ের বিধান সম্পর্কে যা বলা হয়েছে

ছবি: সংগৃহীত

ইসলাম বিবাহকে একটি পবিত্র ও স্থায়ী বন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালোবাসা, দায়িত্ব, পারস্পরিক সম্মান ও শান্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়াই ইসলামের কাম্য। একইভাবে তালাকের ক্ষেত্রেও ইসলাম এমন বিধান দিয়েছে, যাতে আবেগের বশবর্তী হয়ে দাম্পত্য সম্পর্ককে খেলায় পরিণত করা না হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে তালাক ও তিন তালাকের বিধানকে কেন্দ্র করে ‘হিল্লা বিয়ে’ নামে একটি বিকৃত প্রথার প্রচলন দেখা যায়। এর সঙ্গে ইসলামের প্রকৃত বিধানের পার্থক্য স্পষ্টভাবে বোঝা জরুরি।

হিল্লা বিয়ে বলতে কী বোঝায়?

ফিকহের পরিভাষায় ‘তাহলীল’ বলা হয় এমন বিবাহকে, যার উদ্দেশ্য হলো তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীকে পূর্বের স্বামীর জন্য পুনরায় হালাল করে দেওয়া। অর্থাৎ কোনো নারীকে তিন তালাক দেওয়ার পর পরিকল্পিতভাবে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে এ শর্তে বা উদ্দেশ্যে বিয়ে দেওয়া যে, হিল্লা বিয়ে করা স্বামী কিছুদিন পর তাকে তালাক দিয়ে দেবেন এবং এরপর সে নারী প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যাবে। প্রচলিত ভাষায় এটিই ‘হিল্লা বিয়ে’ নামে পরিচিত।

ইমাম কাসানি রহ. লিখেছেন, যদি দ্বিতীয় বিবাহের উদ্দেশ্য হয় নারীকে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল করে দেওয়া, তাহলে এ ধরনের বিবাহকে ‘নিকাহুত তাহলীল’ বলা হয়। (বাদায়েউস সানায়ে ৩/১৮৪) 

অতএব, তিন তালাকের পর একজন নারী অন্য পুরুষকে স্বাভাবিকভাবে বিয়ে করে সংসার করলেন, পরে কোনো স্বাভাবিক কারণে সেই বিবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, এটিকে পরিকল্পিত হিল্লা বলা যাবে না।

কোরআনে কি হিল্লা বিয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّىٰ تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۗ فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَنْ يَتَرَاجَعَا إِنْ ظَنَّا أَنْ يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ

অতঃপর সে যদি তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য একজন স্বামীকে বিবাহ করে। এরপর সেই স্বামী যদি তাকে তালাক দেয়, তাহলে তারা উভয়ে যদি মনে করে যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে, তবে তাদের পুনরায় একত্রিত হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো গুনাহ নেই। (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৩০)

এ আয়াত কোনো নারীকে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে দ্বিতীয় বিয়ে করানোর নির্দেশ দেয়নি। বরং তিন তালাকের পর প্রথম স্বামীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। পরবর্তী বিবাহ হতে হবে প্রকৃত বিবাহ, যার উদ্দেশ্য হবে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন।

হানাফি ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ ’আল হিদায়া’তে বলা হয়েছে, তিন তালাকপ্রাপ্তা নারী দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করার পর যদি দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দেন এবং তার ইদ্দত শেষ হয়, তখন প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিবাহের সুযোগ হয়। (আল হেদায়া: ১/২১৯) 

অর্থাৎ শুধু দ্বিতীয় ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ের আকদ সম্পন্ন হলেই প্রথম স্বামীর জন্য নারী হালাল হয়ে যায় না; প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্কও প্রয়োজন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) হিল্লাতে উৎসাহিত করেছেন, নাকি নিষেধ করেছেন?

পরিকল্পিত হিল্লার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ হিল্লাকারী এবং যার জন্য হিল্লা করা হয়, উভয়ের ওপর লানত করেছেন। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২০৭৬; জামে তিরমিজি, হাদিস: ১১২০)

‘মুহাল্লিল’ হলো সেই ব্যক্তি, যে প্রথম স্বামীর জন্য নারীকে হালাল করার উদ্দেশ্যে তাকে বিয়ে করে। আর ‘মুহাল্লাল লাহু’ হলো সেই প্রথম স্বামী, যার কাছে নারীকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়।

তালাক দেওয়ার পর স্ত্রীকে আবার বিয়ে করা যাবে?
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’-এও নিকাহে তাহলীলের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে এবং এ ধরনের উদ্দেশ্য ও ব্যবস্থা যে শরিয়তের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়, তা স্পষ্ট করা হয়েছে। (রদ্দুল মুহতার: ৩/৪১৭)

এক দিনের হিল্লা কি ইসলামের বিধান?

কোনো কোনো সমাজে প্রচলিত আছে, তিন তালাকের পর স্ত্রীকে এক দিন বা কয়েক দিনের জন্য অন্য পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দিলেই হিল্লা সম্পন্ন হবে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ইসলামে ‘এক দিনের হিল্লা’, ‘এক রাতের হিল্লা’ কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সাজানো কোনো বিবাহের বিধান নেই।

হজরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করেছেন, দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্ক সংঘটিত না হলে শুধু বিবাহের আকদ প্রথম স্বামীর জন্য নারীকে হালাল করে না। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

এ কারণেই কোনো নারীকে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া এবং সেই পুরুষের তালাকের পর তাকে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে আনা শরিয়তের উদ্দেশ্য নয়।

দ্বিতীয় স্বামী কি অবশ্যই তালাক দেবেন?

হিল্লা বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্বামীর জন্য কি সেই স্ত্রীকে তালাক দেওয়া আবশ্যক? এক্ষেত্রে ফেকাহবিদদের বক্তব্য হলো, না। এটি হিল্লা সম্পর্কে আরেকটি প্রচলিত ভুল ধারণা। দ্বিতীয় বিবাহ যদি স্বাভাবিকভাবে সংঘটিত হয় এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুন্দর দাম্পত্য জীবন প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তাদের সংসারই চলবে। দ্বিতীয় স্বামীর ওপর স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কোনো শরয়ি দায়িত্ব নেই।

তিন তালাকের পর একজন নারী যদি অন্য পুরুষকে স্বাভাবিকভাবে বিয়ে করেন, প্রকৃত দাম্পত্য জীবন যাপন করেন এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিবাহ কোনো স্বাভাবিক কারণে শেষ হয়ে যায়, তাহলে ইদ্দত শেষ হওয়ার পর প্রথম স্বামীর সঙ্গে নতুন করে বিবাহের সুযোগ হতে পারে। কিন্তু  প্রথম স্বামীর কাছে ফেরানোর উদ্দেশ্য যদি শুরু থেকেই দ্বিতীয় বিবাহের ভিত্তি হয়, তখন সেটিই নিকাহে তাহলীল বা পরিকল্পিত হিল্লার অন্তর্ভুক্ত।

ইসলাম কেন হিল্লা প্রথাকে সমর্থন করে না?

এর কারণ অত্যন্ত স্পষ্ট। ইসলাম বিবাহকে কোনো সাময়িক চুক্তি বা একজন নারীর মাধ্যমে তালাকের পরিণতি এড়ানোর কৌশল বানাতে দেয়নি। বিবাহের উদ্দেশ্য হলো প্রশান্তি, ভালোবাসা, দায়িত্ব ও পরিবার গঠন। আল্লাহ তায়লা বলেন, তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। (সুরা আর রূম, আয়াত: ২১)।

সুতরাং কোনো নারীকে অর্থের বিনিময়ে, সামাজিক চাপে অথবা পূর্বপরিকল্পিত চুক্তির মাধ্যমে সাময়িকভাবে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া ইসলামের বিবাহব্যবস্থার উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি বিষয় মনে রাখা দরকার। কোনো ব্যক্তি বাস্তবে তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছেন কি না, কী শব্দে তালাক দিয়েছেন, কখন দিয়েছেন, এর আগে কোনো তালাক হয়েছিল কি না এবং তিন তালাক একসঙ্গে উচ্চারণ করা হয়েছে কি না, এসবের ওপর শরয়ি হুকুম ভিন্ন হতে পারে। তাই বাস্তব কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে লোকমুখে প্রচলিত ‘হিল্লা করিয়ে নিন’ ধরনের পরামর্শ গ্রহণ না করে পুরো ঘটনা কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে তুলে ধরে ফতোয়া নেওয়া উচিত।

তিন তালাকের পরিণতি গুরুতর। তাই তালাকের শব্দ উচ্চারণের আগে পরিবার, সালিশ ও সংশোধনের সব বৈধ পথ গ্রহণ করা উচিত। আর কোনো নারীকে পরিকল্পিত হিল্লা বিয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া যেমন শরিয়তের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী, তেমনি তাকে এ ধরনের ব্যবস্থায় বাধ্য করাও জুলুম।

মনে রাখতে হবে, ইসলাম ’হিল্লা বিয়ে’তে উৎসাহিত করেনি; বরং পরিকল্পিত তাহলীলের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও নিন্দা এসেছে। 

কোরআনের সুরা বাকারার ২৩০ নম্বর আয়াত কোনো সাজানো হিল্লা ব্যবস্থার অনুমতি দেয়নি; বরং এটি তিন তালাকের পরিণতি নির্ধারণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ি বিধান। 

তিন তালাকের পর স্বাভাবিকভাবে সংঘটিত দ্বিতীয় বিবাহকে পরিকল্পিত হিল্লার সঙ্গে এক করে দেখা যেমন ভুল, তেমনি প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিত দ্বিতীয় বিবাহকে ইসলামের বিধান মনে করাও সম্পূর্ণ ভুল।

ইসলামের শিক্ষা হলো, বিবাহকে সম্মান করা, তালাকের ব্যাপারে সংযমী হওয়া এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখাকে কোনো কৃত্রিম কৌশলে পাশ কাটানোর চেষ্টা না করা।

ধর্ম থেকে আরো পড়ুন