ছবি সংগৃহীত :
আল-কোরআন মানবজাতির জন্য মুক্তির দিশা এবং হেদায়েতের উৎস। আল্লাহ পবিত্র কোরআনকে সব জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উৎস বানিয়েছেন।
মনুষ্যত্ব, মানবিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ মানুষকে সত্যিকার মানুষে পরিণত করে। মনুষ্যত্বহীন মানুষ মানুষরূপী পশু।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মানবজাতিকে মনুষ্যত্ব ও মানবিকতা শিক্ষা দিয়েছেন। নিম্নে এই বিষয়ে আলোচনা করা হলো।
মানুষের মানবিক মর্যাদার স্বীকৃতি
ইসলাম প্রত্যেক মানুষের মানবিক মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতি, বর্ণ ও ধর্মের বিবেচনা করেনি।
আল্লাহ বলেন, ‘আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদের উত্তম রিজিক দান করেছি এবং আমি যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের ওপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’
(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭০)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরের পরিচিত হতে পারো।
তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে-ই অধিক মর্যাদাবান, যে অধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
আল-কোরআনে মানবিক শিক্ষা
পবিত্র কোরআনে মানবিক জীবন গঠনের সব শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যার কয়েকটি তুলে ধরা হলো—
ক. ব্যক্তিগত জীবনে মানবিক শিক্ষা
১. ন্যায়নিষ্ঠ হওয়া : ইসলাম মানুষকে ব্যক্তিগত জীবনে ন্যায়ের অনুসারী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ন্যায় ও ইনসাফ মানবিকতার প্রথম শর্ত। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচার ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন।
’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯০)
২. দয়া ও অনুগ্রহ করা : মুমিন ব্যক্তিগত জীবনে দয়াশীল হবে এবং অন্যের প্রতি মানবিক আচরণ করবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না এবং প্রার্থীকে ভর্ত্সনা কোরো না।’
(সুরা : দুহা, আয়াত : ৯-১০)
৩. ক্ষমা ও সহনশীলতা : ক্ষমা ও সহনশীলতা মুমিনের অন্যতম সৌন্দর্য। আল্লাহ মুমিনকে মুমিনের প্রতি ক্ষমা ও সহনশীল আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে তারা আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা হিজরত করেছে তাদেরকে কিছুই দেবে না; তারা যেন তাদেরকে ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন? এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২২)
৪. শত্রুতা ও বিদ্বেষ পরিহার : ইসলাম সর্বাবস্থায় হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা পরিহারের নির্দেশ দেয়, বিশেষত বিদ্বেষ যখন মানুষকে ন্যায়বিচারে প্রতিবন্ধক হয়। আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে, সুবিচার করবে, এটা তাকওয়ার নিকটতর।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮)
৫. অন্যের সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষা করা : ইসলাম মানুষের সম্মান ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা প্রদানের নির্দেশ দেয়। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা বেশির ভাগ অনুমান থেকে দূরে থাকো। কেননা অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপ এবং তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান কোরো না; একে অপরের পেছনে নিন্দা কোরো না।’
(সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)
খ. পারিবারিক জীবনে মানবিক শিক্ষা
১. স্নেহ ও আনুগত্যের বন্ধন : ইসলামের দৃষ্টিতে পরিবার হবে স্নেহ ও আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ। বড়রা ছোটদের প্রতি স্নেহশীল হবে এবং ছোটরা বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, তাদের আনুগত্য করবে, বিশেষ করে মা-বাবার প্রতি। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৮)
২. শিশুকে মনুষ্যত্বের পাঠদান : পারিবারিক জীবনে মানবিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিশুকে এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করা, যেন সে মানবিক মানুষ হয়ে উঠতে পারে। শিশুকে উত্তম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা শিশুর প্রতি চরম অবিচার। আল্লাহ বলেন, ‘এবং যারা ঈমান আনে ও তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানে তাদের অনুগামী হয়, তাদের সঙ্গে মিলিত করব তাদের সন্তান-সন্ততিকে এবং তাদের কর্মফল আমি কিছুমাত্র হ্রাস করব না; প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী।’ (সুরা : তুর, আয়াত : ২১)
৩. ভালোবাসা ও মমতার দাম্পত্য : দাম্পত্য জীবনে মুমিন ভালোবাসা ও মমতার বন্ধন গড়ে তুলবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে আছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্যে থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদের, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য তাতে অবশ্যই বহু নিদর্শন আছে।’
(সুরা : রোম, আয়াত : ২১)
৪. উত্তম আচরণ : মুমিন পরিবারের সবার সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে, বিশেষ করে স্ত্রী ও নারীদের সঙ্গে। আর কোনো কারণে তাদের প্রতি মনঃক্ষুণ্ন হলে ধৈর্য ধারণ করবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের সঙ্গে সত্ভাবে জীবন যাপন করবে; তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ করো তবে এমন হতে পারে যে আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন, তোমরা তাকেই অপছন্দ করছ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)
৫. মৌলিক অধিকারে নারী-পুরুষ সমান : পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে ইসলাম নারী ও পুরুষকে সমান অধিকার দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নারীদের ওপর তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন আছে তাদের ওপর পুরুষদের।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২২৮)
গ. সামাজিক জীবনে মানবিক শিক্ষা
১. সবার প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ : ইসলাম সবার প্রতি দয়া, অনুগ্রহ ও উত্তম আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা দয়া করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ দয়াশীলদের ভালোবাসেন।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)
২. বিপদ ও দুর্দিনে পাশে থাকা : মুমিন অন্য মুমিনের দুঃখ ও দুর্দিনে পাশে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তদুপরি সে অন্তর্ভুক্ত হয় মুমিনদের এবং তাদের, যারা পরস্পরকে উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণের ও দয়া-দাক্ষিণ্যের।’ (সুরা : বালাদ, আয়াত : ১৭)
৩. নেক কাজে সহযোগিতা করা : মুমিন নেক কাজে পরস্পরের সহযোগী। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা নেক ও আল্লাহভীতিতে পরস্পরকে সাহায্য কোরো। তোমরা পাপ ও অবাধ্যতায় পরস্পরকে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
৪. অসহায় মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ : মুমিনরা সমাজের অসহায় মানুষের দায়িত্ব নেবে, যদিও তারা নিজেরা অভাবগ্রস্ত হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘আহার্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিদের আহার্য দান করে।’ (সুরা : দাহর, আয়াত : ৮)
৫. বিবাদ নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া : মুসলমান মুসলমানের ভাই। তাই সমাজে যখন কোনো বিরোধ ও সংঘাত দেখা দেয়, তখন মুমিন সেই বিবাদ নিরসনের উদ্যোগ নেয়। এটা তার ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা ভাই-ভাই। সুতরাং তোমাদের ভাইদের ভেতর মীমাংসা করে দাও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)
প্রকৃত পক্ষে মানবিকতার এমন দিক নেই, যা পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়নি। স্থান সংকীর্ণ হওয়ায় যার সামান্য কয়েকটি তুলে ধরা হলো।
আল্লাহ সবাইকে মানবিক জীবন ধারণের তাওফিক দিন। আমিন।
ধর্ম থেকে আরো পড়ুন