বিশেষ প্রতিবেদন

মৌলভীবাজারে ১০ কোটি টাকার নিরাপদ পানি প্রকল্প, বঞ্চিত আড়াই হাজার পরিবার

বিশেষ  প্রতিবেদন :

বিশেষ প্রতিবেদন :

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ ১২:১২

মৌলভীবাজারে ১০ কোটি টাকার নিরাপদ পানি প্রকল্প, বঞ্চিত আড়াই হাজার পরিবার

মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলায় প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ চার বছরেও শেষ হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি, দীর্ঘসূত্রতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার অভিযোগে প্রকল্পটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে দুই উপজেলার প্রায় আড়াই হাজার পরিবার এখনো নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিবার্টি ট্রেডার্স (জেবি) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজ পায়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় একাধিকবার মেয়াদ বাড়ানো হলেও গত প্রায় এক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির কোনো কার্যক্রম নেই। অভিযোগ রয়েছে, কাজের উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পন্ন না করেই প্রতিষ্ঠানটি সাইট ছেড়ে চলে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের সহযোগিতায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি কাজ পেয়েছে। কমিশনের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পটি ২০২১ সালে শুরু হয় এবং ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) যৌথ বাস্তবায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)। দেশের ৩০ জেলার ৯৮ উপজেলায় পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।

মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দুই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মোট ৭৬টি পানি সরবরাহ স্কিম নির্মাণের কথা রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৩৮টির মধ্যে ২২টিতে আংশিক কাজ হলেও রাজনগর উপজেলার ৩৮টির কোনো কাজই বাস্তবে সম্পন্ন হয়নি। প্রকল্পের কাজ শেষ করতে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে রাজনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে প্রকল্পের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই প্রকল্পটির বিষয়ে অবগত নন। অন্যদিকে সদর উপজেলার চাঁদনিঘাট ইউনিয়নের কির্তার মহল এলাকায় দেখা যায়, নিম্নমানের আংশিক কাজ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চলে যাওয়ার পর উপকারভোগীরাই নিজেদের অর্থায়নে মোটর, পাইপ ও বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে পানির লাইন সচল করেছেন।

কির্তার মহলের বাসিন্দা সুমন মালাকার বলেন, “প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ করে আমরা নিজেরাই পানির লাইন চালু করেছি। এখানে ৩০টি পরিবার পানি ব্যবহার করছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোটর, মিটার, সিঁড়ি—কিছুই দেয়নি। তারা যে পাইপ লাগিয়েছিল সেটাও কয়েক দিনের মধ্যে ফেটে গেছে। অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ হয়েছে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক শাহিন আলম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন কর্মচারী। তিনি নিজের নামে লাইসেন্স ব্যবহার না করে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ পরিচালনা করছেন। একই অধিদপ্তরে চাকরি করেও কীভাবে ঠিকাদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, শাহিন আলমই মূলত প্রকল্পটি পরিচালনা করছেন এবং তার সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক রমিজ মিয়া বলেন, “এই কাজের মূল দায়িত্বে শাহিন নামে একজন রয়েছেন। তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে চাকরি করেন, আবার ঠিকাদারিও করেন। আমি কিছুদিন কাজ তদারকি করেছি। আমার সময়ে প্রায় ৯০ লাখ টাকার বিল উত্তোলন হয়েছিল। পরে আর কী হয়েছে, তা আমার জানা নেই। অফিসের নিয়ম অনুযায়ী কাজ পেতে হলে সবাইকে খুশি রাখতে হয়।”

অন্যদিকে শাহিন আলমের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রাক্কলনিক কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “কাজ একেবারে হয়নি—এমন নয়। তবে এখন নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়ে অবশিষ্ট কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। এছাড়া একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।

জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন বলেন, “বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে আর বঞ্চিত না হন।

বিশেষ প্রতিবেদন থেকে আরো পড়ুন