ছবি: সংগৃহীত
সিলেট অঞ্চলের তরুণ পংকজ তালুকদার কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরে কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই অর্জনের গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বন্ধু, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ ও অভিনন্দন।
পংকজ সিলেটের হাতিম আলী উচ্চবিদ্যালয় ও এমসি কলেজে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরে নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার পরিবারের মূল বাড়ি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পংকজ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পথটি মোটেও সহজ ছিল না। শারীরিক প্রশিক্ষণ, মানসিক প্রস্তুতি এবং বিশেষায়িত সামরিক প্রশিক্ষণের প্রতিটি ধাপেই তাকে কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
তার বর্ণনা অনুযায়ী, অনেক দিন ভোর ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে দিনের প্রশিক্ষণ শুরু হতো এবং শেষ হতো রাত ৮টা থেকে ৯টার দিকে। দীর্ঘ সময় ঘুম ও বিশ্রামের সুযোগ সীমিত থাকলেও প্রতিদিনই শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা ও সহনশীলতার পরীক্ষা দিতে হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণও ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রায় ১১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় টানা চার দিন জঙ্গলে অবস্থান করতে হয়েছে তাকে। প্রচণ্ড গরম, সাপ, পোকামাকড় ও শারীরিক ক্লান্তির মধ্যেও প্রশিক্ষণ চালিয়ে যেতে হয়েছে।
প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে এম৪ রাইফেল দিয়ে গুলি চালানোর অনুশীলন, জীবন্ত গ্রেনেড নিক্ষেপ, মাইন শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন ধরনের দুর্গম বাধা অতিক্রমের প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেছেন পংকজ। প্রায় পাঁচ মাসের কঠোর প্রশিক্ষণে তার ওজন কমেছে ২৬ পাউন্ড। পাশাপাশি প্রায় প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দৌড়াতে হয়েছে।
সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি ছিল কাঁধে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ পাউন্ড ওজনের ভারী ব্যাগ নিয়ে টানা ১০ মাইল হাঁটা। কখনো মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেও এই প্রশিক্ষণ চালিয়ে যেতে হয়েছে। শরীর ভিজে গেলেও থেমে যাওয়ার সুযোগ ছিল না বলে জানিয়েছেন তিনি।
পংকজ বলেন, অনেক সময় শরীর মনে করত আর পারছে না, আবার মন চাইত একটু বিশ্রাম নিতে। কিন্তু থেমে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তখন নিজেকেই বারবার সাহস দিয়ে আরও একবার চেষ্টা করার মানসিকতা ধরে রাখতে হয়েছে।
শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকাও ছিল বড় মানসিক পরীক্ষা। প্রশিক্ষণের সময় মুঠোফোন ব্যবহারের সুযোগ ছিল সীমিত। কখনো মাত্র ৩০ মিনিটের জন্য ফোন হাতে পাওয়ার সুযোগ মিলত। সেই অল্প সময়টুকুতেই পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হতো।
দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সদস্য। নিজের এই যাত্রার দিকে ফিরে তাকিয়ে পংকজ মনে করেন, নির্ঘুম রাত, কঠোর পরিশ্রম, ঘাম ও শারীরিক কষ্টই তাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। এই পুরো সময়ে যারা তাকে সাহস ও মানসিক শক্তি দিয়েছেন, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে পংকজ বলেন, বেসামরিক জীবন থেকে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ করে এখন তিনি গর্বের সঙ্গে বলতে পারেন, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একজন সদস্য।’
তিনি আরও বলেন, এই পথ সহজ ছিল না। কিন্তু প্রতিটি কষ্ট সার্থক হয়েছে। কষ্ট ছিল সাময়িক, গর্ব থাকবে চিরদিন।
সিলেট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসে প্রযুক্তি খাতে পেশাজীবন শুরু করার পর কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ পেরিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরে কর্মকর্তা হিসেবে পংকজের এই যাত্রা এখন তার পরিচিতজনদের কাছে পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়ের অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।
প্রবাস থেকে আরো পড়ুন