ছবি: সংগৃহীত
একজন প্রকৃত মুসলিমের মর্যাদা শুধু তার ইবাদতের পরিমাণে নয়; বরং তার ইমান, চরিত্র, মানুষের প্রতি আচরণ, সততা, দানশীলতা ও সমাজকল্যাণে অবদানের মাধ্যমেও নির্ধারিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রসঙ্গে এমন কিছু মানুষের প্রশংসা করেছেন, যাদের গুণাবলী একজন মুমিনের আদর্শ চরিত্র গঠনের ভিত্তি। আসুন, সহিহ কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সেই মহৎ গুণগুলো জেনে নিই এবং নিজের জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করি।
১. কুরআন শিক্ষা করা এবং অন্যকে শিক্ষা দেওয়া ব্যক্তি
যে ব্যক্তি নিজে কুরআন শেখে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়, তিনি মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (বুখারি ৫০২৭)
২. উত্তম চরিত্রের অধিকারী
সুন্দর চরিত্র একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحْسَنَكُمْ أَخْلَاقًا
‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।’ (বুখারি ৩৫৫৯, মুসলিম ২৩২১)
৩. ঋণ পরিশোধে উত্তম যিনি
আর্থিক লেনদেনে বিশ্বস্ততা ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ خَيْرَكُمْ أَحْسَنُكُمْ قَضَاءً
‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে ঋণ পরিশোধে সবচেয়ে উত্তম।’ (বুখারি ২৩৯৩, মুসলিম ১৬০১)
৪. যার থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে
একজন মুমিন মানুষের জন্য নিরাপত্তা ও কল্যাণের উৎস। যার কাছ থেকে মানুষ কল্যাণের আশা করে এবং অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
خَيْرُ النَّاسِ مَنْ يُرْجَى خَيْرُهُ وَيُؤْمَنُ شَرُّهُ
‘সর্বোত্তম মানুষ সেই, যার কল্যাণের আশা করা যায় এবং যার অনিষ্ট থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে।’ (তিরমিজি ২২৬৩)
৫. নিজের পরিবারের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণকারী
পরিবারের প্রতি উত্তম আচরণ ইমানের অন্যতম পরিচয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ
‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ (তিরমিজি ৩৮৯৫, ইবন মাজাহ ১৯৭৭)
৬. দীর্ঘ জীবন ও উত্তম আমলকারী
দীর্ঘ জীবন লাভকারী ব্যক্তিও উত্তম হয় যদি তার আমল উত্তম হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
خَيْرُ النَّاسِ مَنْ طَالَ عُمُرُهُ وَحَسُنَ عَمَلُهُ
‘সর্বোত্তম মানুষ সেই, যার জীবন দীর্ঘ হয় এবং যার আমল উত্তম হয়।’ (তিরমিজি ২৩৩০)
৭. মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করা ব্যক্তি
মানুষের উপকার করা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
خَيْرُ النَّاسِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ
‘সর্বোত্তম মানুষ সেই, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (তাবারানি ৫৯৩৭)
৮. পবিত্র অন্তর ও সত্যবাদী জিহবার অধিকারী
পরিচ্ছন্ন হৃদয় ও সত্যবাদিতা একজন মুমিনের অলংকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
كُلُّ مَخْمُومِ الْقَلْبِ صَدُوقِ اللِّسَانِ . قَالُوا صَدُوقُ اللِّسَانِ نَعْرِفُهُ فَمَا مَخْمُومُ الْقَلْبِ قَالَ هُوَ التَّقِيُّ النَّقِيُّ لاَ إِثْمَ فِيهِ وَلاَ بَغْىَ وَلاَ غِلَّ وَلاَ حَسَدَ
‘সর্বোত্তম মানুষ হলো সেই ব্যক্তি, যার অন্তর পরিচ্ছন্ন এবং যার জিহ্বা সত্যবাদী। তারা বলেন, যার জিহ্বা সত্যবাদী তাকে তো আমরা চিনি, কিন্তু বিশুদ্ধ অন্তরের ব্যক্তি কে? তিনি বলেন, সে হলো পূত-পবিত্র নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ যার কোনো গুনাহ নাই, নাই কোন দুশমনি, হিংসা-বিদ্বেষ, আত্মহমিকা ও কপটতা।’ (ইবন মাজাহ ৪২১৬)
৯. প্রতিবেশী ও সঙ্গীর প্রতি উত্তম আচরণকারী
সঙ্গী ও প্রতিবেশীর কাছে উত্তম হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
خَيْرُ الْأَصْحَابِ عِنْدَ اللَّهِ خَيْرُهُمْ لِصَاحِبِهِ، وَخَيْرُ الْجِيرَانِ عِنْدَ اللَّهِ خَيْرُهُمْ لِجَارِهِ
‘আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম সঙ্গী সেই, যে তার সঙ্গীর জন্য উত্তম। আর সর্বোত্তম প্রতিবেশী সেই, যে তার প্রতিবেশীর জন্য উত্তম।’ (তিরমিজি ১৯৪৪)
১০. ক্রোধ সংযত রাখে এবং মানুষকে ক্ষমা করে
রাগ সংযত রাখা এবং ক্ষমার মানসিকতা উত্তম মানুষের গুণ। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
‘যারা ক্রোধ সংবরণ করে, মানুষকে ক্ষমা করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪)
১১. মানুষকে খাদ্য দান করে এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেয়
ক্ষুধার্তকে মানুষকে খাবার দান করা এবং সব মুসলিমকে সালাম দেওয়া উত্তম গুণ। হাদিসে পাকে এসেছে—
تُطْعِمُ الطَّعَامَ وَتَقْرَأُ السَّلَامَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ
‘তুমি মানুষকে খাদ্য খাওয়াবে এবং যাকে চেনো ও যাকে চেনো না—সবার প্রতি সালাম দেবে।’ (বুখারি ২৮, মুসলিম ৩৯)
১২. আল্লাহর পথে জান ও মাল উৎসর্গকারী মুমিন
এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কোন মানুষ সর্বোত্তম?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন—
مُؤْمِنٌ يُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ
‘সেই মুমিন, যে আল্লাহর পথে নিজের জান ও মাল দিয়ে সংগ্রাম করে।’ (বুখারি ২৭৮৬, মুসলিম ১৮৮৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেননি; তিনি এমন একটি আদর্শ চরিত্রের শিক্ষা দিয়েছেন, যা একজন মানুষকে আল্লাহর কাছে প্রিয় এবং সমাজের কাছে সম্মানিত করে। কুরআন শিক্ষা, উত্তম চরিত্র, সত্যবাদিতা, পরিবার ও প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ, মানুষের উপকার, ক্ষমাশীলতা, দানশীলতা এবং আল্লাহর পথে ত্যাগ—এসব গুণ একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়।
আসুন, আমরা শুধু এসব গুণ সম্পর্কে জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের জীবনেও বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে উত্তম চরিত্রের অধিকারী বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
ধর্ম থেকে আরো পড়ুন