ছবি: সংগৃহীত
সংবিধান সংশোধনে সরকারের গঠিত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটিকে ‘প্রহসন’ আখ্যা দিয়েছে বিরোধী দল। তাদের দাবি, সংবিধান সংশোধন নয়, গণভোট ও ‘জুলাই সনদ’-এর আলোকে প্রয়োজন পুরো সংবিধানের আমূল সংস্কার। এ প্রেক্ষাপটে রাজপথে বড় ধরনের আন্দোলনের দিকে এগোচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের অন্যতম শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে উল্লেখ করে এনসিপির একটি সূত্র জানায়, সরকার দ্রুত সংবিধান সংস্কারে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে রাজপথে ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। বিদ্যমান সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব নয় বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। তারা কমিটি গঠন না করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবিতে অনড় থাকেন।
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা কখনোই বলিনি এ কমিটিতে নাম দেব। আমরা জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নিয়েছি। সেটি বাইপাস করার জন্য যদি এই কমিটি গঠন করা হয়, তাহলে আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি। জনগণের অভিপ্রায় ও মতামতকে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য বা অপমান করা উচিত নয়।
‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নিয়ে জটিলতা:
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের তৈরি ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব রয়েছে, যা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হলে জনগণ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দেয়। তবে গণভোটের এই রায় এবং সনদের বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিএনপি ও বিরোধী জোটের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে।
প্রধান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি সনদের কয়েকটি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবে তাদের নিজস্ব ভিন্নমত পোষণ করে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী জোট কোনো পরিবর্তন ছাড়াই গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়ন এবং ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবি জানাচ্ছে।
" সরকার সংবিধান সংস্কারের নামে প্রহসন না করে দ্রুত গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় বাস্তবায়ন করুক। অন্যথায়, জুলাই বিপ্লবের সব অংশীজন ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাজপথে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। আন্দোলন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, সরকার চাইলে এখনো সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সুযোগ রয়েছে ''
(বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম)
গণভোটের বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের একই সঙ্গে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার কথা ছিল। বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা এ শপথ নিলেও বিএনপি নেয়নি। ফলে এ পরিষদ গঠন করা সম্ভব হয়নি। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী ১৫ মার্চের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন ডাকার সময়সীমা পার হয়ে গেছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন আলোচনায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী গণভোট ও জুলাই সনদের পক্ষে প্রচার চালালেও নির্বাচনের পর ৭০% জনগণের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছেন না। এখনো হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। তবে প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় এমন কর্মসূচি দেওয়া হবে।
"জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য গণভোট হয়েছে, যেটির জন্য বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেও সরাসরি ভোট চেয়েছেন। আমরা দেখছি নির্বাচনের পর বিএনপি তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির জায়গা থেকে সরে এসেছে "
(এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব)
তিনি বলেছেন, সরকার সংবিধান সংস্কারের নামে প্রহসন না করে দ্রুত গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় বাস্তবায়ন করুক। অন্যথায়, জুলাই বিপ্লবের সব অংশীজন ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাজপথে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। আন্দোলন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, সরকার চাইলে এখনো সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সুযোগ রয়েছে।
জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার গণমাধ্যমকে বলেন, বিএনপি সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি করেছে। সেখানে আমাদের কাছে নাম চাওয়া হয়েছে, আমরা দিইনি। আমরা সংবিধান সংস্কারের জন্য আন্দোলন করছি। দেখা যাক, কী হয়।
"বিএনপির গদি মোটা হয়ে গেছে। এখন জনগণকে তাদের গোনার সময় নেই। সংবিধান সংস্কার না হলে যেকোনো মুহূর্তে জনগণ এই সংবিধানের বিরুদ্ধেই ফুঁসে উঠবে"
(এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী)
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ঢাকা পোস্টকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য গণভোট হয়েছে, যেটির জন্য বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেও সরাসরি ভোট চেয়েছেন। আমরা দেখছি নির্বাচনের পর বিএনপি তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির জায়গা থেকে সরে এসেছে।
তিনি বলেন, এমন অবস্থায় ১১ দলীয় জোট সারা দেশের বিভাগীয় পর্যায়ে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের জন্য সমাবেশ করেছে। আগামী ২৫ জুলাই সিলেট এবং সর্বশেষ ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ হবে। সে সমাবেশ থেকেই মূলত গণভোটের গণরায়ের বিষয়ে ১১ দলীয় জোট তাদের চূড়ান্ত ঘোষণা বা পরবর্তী আন্দোলনের রূপরেখা ঘোষণা করবে। আমরাও দলগতভাবে বড় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বিএনপির গদি মোটা হয়ে গেছে। এখন জনগণকে তাদের গোনার সময় নেই। সংবিধান সংস্কার না হলে যেকোনো মুহূর্তে জনগণ এই সংবিধানের বিরুদ্ধেই ফুঁসে উঠবে।
রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন