প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের কোনো আভাস নেই। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর ভোট হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ আট বছরের বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত হয়নি বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নির্বাচন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ২৪ জুন। সে হিসাবে ২০২১ সালেই নতুন কমিটি নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল।
তবে বিভিন্ন জটিলতায় সেই নির্বাচন এখনও অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে তিন বছরের জন্য নির্বাচিত কমিটিই টানা আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছে।
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৬৮টি চা-বাগান রয়েছে। এসব বাগানে নিবন্ধিত ভোটার প্রায় এক লাখ।
প্রত্যক্ষ ভোটে পঞ্চায়েত, ভ্যালি ও কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হওয়ার বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় অনেক বাগানে নির্বাচিত পঞ্চায়েত কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও কোথাও পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিকেরা। তাদের ভাষ্য, এতে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরা, অধিকার আদায় এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে কার্যকর আলোচনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকেরা বলেন, নির্বাচন না হওয়ায় সংগঠনের ভেতরে বিভাজন ও অসন্তোষ বাড়ছে। নির্বাচিত প্রতিনিধির অভাবে মজুরি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক বিষয় মালিকপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
শমশেরনগর চা-বাগানের নারী চা-শ্রমিক পূর্ণিমা রেলি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন হয়নি। যারা নির্বাচিত হন, তারা আর এই পদ ছাড়তে চান না। চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করেন না। দ্রুত নির্বাচন দেওয়া হোক।’
চা-শ্রমিক নেতা আকাশ দোষাদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় সংগঠন কার্যত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের কথা বলার মতো কার্যকর প্ল্যাটফর্ম নেই। বিভিন্ন অজুহাতে বছরের পর বছর একই নেতৃত্ব বহাল রয়েছে। অনেক বাগানে ২০১৮ সালের নির্বাচিত পঞ্চায়েত কমিটি বিলুপ্ত করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই।’
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরীর মতে, নির্বাচন বিলম্বের অন্যতম কারণ গঠনতন্ত্র সংশোধন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান কমিটি গঠনতন্ত্র সংশোধন করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে তুলেছে। আট বছর ধরে কেন্দ্রীয় নির্বাচন না হওয়ায় চা-শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ছে। অতীতে সরকারের তত্ত্বাবধানে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই এবারও সরকারের তত্ত্বাবধানেই নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানাচ্ছি। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় চা-বাগানগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের আয়োজন করার দায়িত্ব চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের। তারা এটি না করে শুধু বলছেন, নির্বাচন করবেন। আমাদের কথা হলো, নির্বাচনের আয়োজন করে আপনারাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুন।’
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পঙ্কজ কন্দ বলেন, নির্বাচন বিলম্বের পেছনে শুধু অর্থসংকট নয়, প্রশাসনিক জটিলতাও রয়েছে। অতীতে সরকারের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। এবারও সরকারকে একইভাবে নির্বাচন আয়োজনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিষয়টি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পঙ্কজ কন্দ আরও বলেন, ‘শ্রমকল্যাণ মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তারা আমাদের জানিয়েছেন, দ্রুত তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। আমরা আশা করছি, সব জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত তফসিল ঘোষণা হবে। আমরা একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন চাই।’
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘২০২৩ সালে সরকার জানায়, নির্বাচনের জন্য কোনো অর্থ সরকার দিতে পারবে না। আমাদের নিজেদের অর্থ দিয়ে চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন করতে হবে। তখন আমরা নির্বাচনের জন্য ২৫ লাখ টাকা সরকারকে দিয়েছি। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শ্রম উপদেষ্টার সঙ্গে আমরা বৈঠক করেছি। তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের আয়োজন করে দেবেন। কিন্তু সেটিও কেবল আশ্বাসের মধ্যেই থেকে গেছে।’
নৃপেন পাল আরও বলেন, ‘সবশেষে আমরা শ্রম মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি বলেছেন, জুলাই ২০২৬-এ নির্বাচনের আয়োজন করে দেবেন। তবে সন্ধ্যা রানি ভৌমিক নামে একজন হাইকোর্টে একটি মামলা করেন। হাইকোর্ট বিষয়টি শ্রম অধিদপ্তরকে দায়িত্ব দেয়। শ্রম অধিদপ্তর বিষয়টির জবাব দিয়েছে। এখন চা-শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কয়েক দিনের মধ্যে মামলার শুনানি করা হবে। আশা করি, মামলা নিষ্পত্তি হলে সরকারের সহযোগিতায় আমরা নির্বাচন করতে পারব। প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া এত বড় নির্বাচন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ৯ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচন কমিশনের মধ্যে তিনজন সরকারের প্রতিনিধি এবং ছয়জন শ্রমিক প্রতিনিধি থাকেন।’
সিলেট বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের শ্রীমঙ্গলের উপ-পরিচালক মহব্বত হোসাইন বলেন, ‘বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজনের জন্য সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। মন্ত্রী মহোদয় নিজেও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন। এর আগের সরকার চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের জন্য একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিল। সে সময় চা-শ্রমিকদের একটি পক্ষ নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। সেখানে আমাদেরও বিবাদী করা হয়েছিল। ডিডি মহোদয় এর জবাব দিয়েছেন।’
তিনি বলেন, নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাকি প্রক্রিয়া, অর্থের সংস্থান এবং ভোটার তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। হাইকোর্ট-সংক্রান্ত জটিলতা মিটলেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন