ছবি: সংগৃহীত
কিছুদিন আগেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন সময়ের অন্যতম সেরাটা ফুটবলার লিওনেল মেসি। এবার তার দেখানো পথেই হাঁটলেন আরেক ফুটবল কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।
আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে একের পর এক রেকর্ড গড়েছেন এই পর্তুগিজ মহাতারকা। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোল ও সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড—দুটিই তার দখলে। ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা ইউরো এবং ফিফা বিশ্বকাপেও রয়েছে তার একাধিক অনন্য কীর্তি।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর যাত্রা শুরু ২০০৩ সালের ২০ আগস্ট। কাজাখস্তানের বিপক্ষে পর্তুগালের জার্সিতে অভিষেকের পর দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন তিনি। এই দীর্ঘ সময়ে গোল, ম্যাচ, বড় টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিকতার বিচারে গড়েছেন একের পর এক রেকর্ড।
উয়েফার ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর আন্তর্জাতিক ম্যাচ ২৩৪টি, গোল ১৪৬টি। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই দুই বিভাগেই তিনি বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী। তার পরের অবস্থানে আছেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি—২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোল
পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদো। ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে জোড়া গোল করে তিনি ইরানের সাবেক স্ট্রাইকার আলী দাইয়ের ১০৯ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে যান। দাইয়ে ১৯৯৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ইরানের হয়ে ১০৯ গোল করেছিলেন।
রোনালদো ২০২৬ সালের অক্টোবরের মধ্যে নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে যান ১৪৬-এ। অর্থাৎ দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসির চেয়ে ২০ গোল এগিয়ে তিনি। ১০০ আন্তর্জাতিক গোলের মাইলফলকও স্পর্শ করেন রোনালদো—পুরুষদের ফুটবলে আলী দাইয়ের পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে।
জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ
গোলের মতো ম্যাচ খেলার রেকর্ডও রোনালদোর দখলে। ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ লিশটেনস্টাইনের বিপক্ষে মাঠে নেমে পর্তুগালের হয়ে নিজের ১৯৭তম ম্যাচ খেলেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে কুয়েতের বদর আল-মুতাওয়ার ১৯৬ ম্যাচের বিশ্বরেকর্ড ছাড়িয়ে যান।
এরপর ২০২৩ সালের জুনে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে নেমে প্রথম ফুটবলার হিসেবে আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা ২০০-তে নিয়ে যান। ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তার ম্যাচসংখ্যা ২৩৪। দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলার এই নজিরও তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
বিশ্বকাপেও বাজিমাত রোনালদোর
বিশ্বকাপের ইতিহাসেও রোনালদোর একটি অনন্য রেকর্ড রয়েছে। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬—ছয়টি বিশ্বকাপ আসরেই গোল করেছেন তিনি। পুরুষদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম খেলোয়াড় রোনালদো।
২০০৬ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইরানের বিপক্ষে প্রথম বিশ্বকাপ গোল করেন তিনি। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, রাশিয়া, কাতার ও ২০২৬ সালের আসরেও গোলের দেখা পান।
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপে রোনালদোর ম্যাচ ২৭টি এবং গোল ১১টি। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার তালিকায় তিনি দ্বিতীয় অবস্থানে। পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি।
ইউরোতে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও গোল
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা ইউরোতে রোনালদোর রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ। টুর্নামেন্টটির চূড়ান্ত পর্বে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার পাশাপাশি সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও তার।
উয়েফার হিসাবে, ইউরোর চূড়ান্ত পর্বে রোনালদোর ম্যাচ ৩০টি এবং গোল ১৪টি। বাছাইপর্বসহ ইউরোতে তার ম্যাচ ৭৪টি, গোল ৫৫টি। ইউরোর ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড়ের এত বেশি গোল নেই।
২০০৪ সালে নিজের প্রথম ইউরো আসরে খেলেন রোনালদো। এরপর ২০০৮, ২০১২, ২০১৬, ২০২০ ও ২০২৪—সব মিলিয়ে ছয়টি আসরে অংশ নিয়েছেন। ছয় আসরে খেলার রেকর্ডও তার।
২০০৪ সালে পর্তুগাল ফাইনালে উঠলেও গ্রিসের কাছে হেরে যায়।
২০১৬ সালে ফ্রান্সকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ইউরো শিরোপা জেতে পর্তুগাল। ফাইনালে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হলেও দলের শিরোপা জয়ের মুহূর্তে অধিনায়ক রোনালদো ছিলেন মাঠের বাইরে থেকে দলের প্রেরণা।
বাছাইপর্বেও গোলের বিশ্বরেকর্ড
বিশ্বকাপ ও ইউরো—দুই প্রতিযোগিতার বাছাইপর্বেই গোলের রেকর্ড গড়েছেন রোনালদো। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তার গোল ৪১টি। পুরুষদের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ।
ইউরো বাছাইপর্বেও তার গোল ৪১টি। ইউরোর চূড়ান্ত পর্বে ১৪ গোল যোগ করলে প্রতিযোগিতাটিতে তার মোট গোল দাঁড়ায় ৫৫। ইউরোর বাছাইপর্ব ও চূড়ান্ত পর্ব মিলিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনিই।
টানা ২৩ বছর গোল
দীর্ঘ সময় ধরে গোল করার ধারাবাহিকতাও রোনালদোর বড় অর্জন। ২০০৩ সালে পর্তুগালের হয়ে অভিষেক হলেও প্রথম দুই ম্যাচে গোল পাননি। ২০০৪ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করার পর ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা ২৩ বছর জাতীয় দলের হয়ে গোল করেছেন তিনি।
উয়েফার তথ্য অনুযায়ী, পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে টানা এত বছর গোল করার রেকর্ডও রোনালদোর। এর আগে আয়ারল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার রবি কিন ১৯৯৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত টানা ১৯ বছর গোল করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ১০ হ্যাটট্রিক
পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর হ্যাটট্রিকের সংখ্যাও অনন্য। উয়েফার রেকর্ড অনুযায়ী, পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ১০টি হ্যাটট্রিক করেছেন তিনি। এর মধ্যে দুটি ম্যাচে চারটি করে গোল করেছেন। এ ছাড়া ২৮টি ম্যাচে জোড়া গোল করেছেন।
প্রতিপক্ষ হিসেবে লুক্সেমবার্গের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি ১১টি গোল করেছেন রোনালদো। হাঙ্গেরির বিপক্ষে তার গোল ৯টি। আর্মেনিয়া, লিথুয়ানিয়া ও সুইডেনের বিপক্ষে করেছেন সাতটি করে গোল।
ছয় বিশ্বকাপ ও ছয় ইউরো
একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার সাধারণত সীমিত সময়ের। কিন্তু রোনালদো দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলে একাধিক প্রজন্মের সতীর্থদের সঙ্গে মাঠে নেমেছেন। ছয়টি বিশ্বকাপ ও ছয়টি ইউরো আসরে অংশ নেওয়া তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রমাণ।
২০২৬ বিশ্বকাপের পর ফিফাকে দেওয়া বক্তব্যে রোনালদো জানান, বিশ্বকাপের মঞ্চে সেটিই ছিল তার শেষ অংশগ্রহণ। তবে জাতীয় দল থেকে অবসরের বিষয়ে ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির পর পর্তুগালের জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর পরিকল্পনার কথা তিনি জানিয়েছেন। সে সময় তার আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিল ২৩৪টি এবং গোল ১৪৬টি।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.