প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৫১ (রবিবার)
মৌলভীবাজারে মনু নদ দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে, হারাচ্ছে চিরচেনা রূপ

মৌলভীবাজার পৌর শহরের বুক চিরে বয়ে চলা একসময়ের খরস্রোতা মনু নদ এখন দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত। অব্যাহত দখলে কমেছে নদীর নাব্যতা, অন্যদিকে ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলার কারণে দূষিত হচ্ছে পানি ও জীববৈচিত্র্য। একসময়ের প্রাণচঞ্চল এই নদ এখন পরিণত হচ্ছে অপরিচ্ছন্ন জলধারায়। দীর্ঘদিন ধরে নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও বর্জ্য অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, যে যার মতো করে মনু নদ ব্যবহার করছেন। দিনের পর দিন নদীতে দখল ও দূষণ চলতে থাকায় এর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। একসময় নদীর পানি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা গেলেও বর্তমানে দূষণের কারণে তা আর ব্যবহার উপযোগী নেই। শহরের বিভিন্ন স্থানে একাধিক স্নানের ঘাট থাকলেও অধিকাংশই এখন দখল হয়ে গেছে। বর্তমানে চাঁদনীঘাট মনু সেতুর পাশে সৈয়ারপুর এলাকার একটি ঘাট ছাড়া অন্য ঘাটগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। তাদের মতে, মনু নদকে সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করে সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হলে এটি শহরবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মনু নদ মৌলভীবাজার পৌর শহরকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। শহরের দুই অংশের মধ্যে যোগাযোগের জন্য নদটির ওপর অন্তত তিনটি সেতু রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে একটি বাঁশের সাঁকো। এসব সেতুর মধ্যে চাঁদনীঘাট সেতু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শহরের প্রধান সড়কে যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এ সেতু ব্যবহার করেন।

চাঁদনীঘাট সেতুর উত্তর-পূর্ব পাশে রয়েছে কাঁচাবাজার। অভিযোগ রয়েছে, বাজারের ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত নদে ফেলা হচ্ছে। শুধু বাজার এলাকাই নয়, শহরের ভেতরে নদটির বিভিন্ন স্থানে জমে রয়েছে বর্জ্যের স্তূপ। এতে পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া চাঁদনীঘাট সেতুর পশ্চিম-উত্তর পাশে মনু নদের বাঁধের ভেতরে একাধিক অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলতে দেখা গেছে।

চাঁদনীঘাট সেতুসংলগ্ন এলাকার ব্যবসায়ী জুরেল আহমদ বলেন, নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। নোংরা পরিবেশে মশা-মাছির উপদ্রব বেড়েছে। মাঝেমধ্যে নদীতে মাছ মরে ভেসে উঠতেও দেখা যায়। কয়েক বছর আগে প্রশাসন কিছু এলাকা দখলমুক্ত করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তদারকির অভাবে সেসব জায়গা আবারও দখল হয়ে যাচ্ছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার অংশে মনু নদের দৈর্ঘ্য ৭৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ছয় কিলোমিটার প্রবাহিত হয়েছে মৌলভীবাজার পৌর শহরের ভেতর দিয়ে।

শহরের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, একসময় খরস্রোতা মনু নদ ছিল অত্যন্ত প্রাণচঞ্চল। নদে পানির প্রবাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। বরিশাল, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় মহাজনি নৌকা আসত। পালতোলা নৌকা, স্টিমার ও লঞ্চের চলাচলে মুখর থাকত নদটি। কিন্তু প্রায় তিন দশক ধরে বড় নৌযানের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে নদটি তার আগের রূপ হারিয়েছে।

পৌর শহরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, গৃহস্থালি বর্জ্যসহ বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা নদীতে ফেলার কারণে দিন দিন দূষণ বাড়ছে। নদ দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয়দের মতে, মনু নদকে রক্ষা করতে হলে শুধু লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান নয়, প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বর্জ্য ফেলা বন্ধ, নদী পরিষ্কার এবং স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় একসময়ের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাণচঞ্চল মনু নদ তার জীববৈচিত্র্য ও স্বাভাবিক অস্তিত্ব আরও হারাবে।

এ বিষয়ে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন ওয়ালীদ বলেন, মনু নদের বাঁধের ভেতরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, মনু নদকে দখল ও দূষণমুক্ত করে এর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।