ছবি: সংগৃহীত
অ্যালকোহল গ্রহণ না করলেও লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গভীর রাতে খাবার খাওয়া, প্যাকেটজাত ফলের রস পান করা বা দীর্ঘ সময় ডেস্কে বসে কাজ করা- এসব বিষয় আলাদাভাবে হয়তো ক্ষতিকর মনে হয় না। কিন্তু যখন এই অভ্যাসগুলো দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা শরীরের শর্করা নিয়ন্ত্রণ, চর্বি জমা এবং ইনসুলিনের প্রতি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাকে ব্যাহত করতে পারে।
যারা অ্যালকোহল পান করেন না, তাদের মধ্যেও ফ্যাটি লিভারের সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ফ্যাটি লিভার দীর্ঘ বছর কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরে থাকতে পারে এবং পরবর্তীতে এটি প্রদাহ, লিভারে ক্ষত (স্কারিং) এমনকূ সিরোসিসের মতো গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। দৈনন্দিন জীবনের এমন পাঁচটি অভ্যাসের কথা তুলে ধরা হলো, যেগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন-
দেরিতে খাবার খাওয়া এবং খাওয়ার পরপরই ঘুমাতে যাওয়া
রাতে দেরিতে খাবার খাওয়া মানেই যে তা ক্ষতিকর, তা নয়। তবে নিয়মিত ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার খেলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে, সেই সঙ্গে ঘনঘন স্ন্যাকস খাওয়ার অভ্যাস বা অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসও গড়ে উঠতে পারে। এই অভ্যাসগুলো বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে যখন প্রতিদিনের ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে যায়। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো খাবারের ধরন। অতিরিক্ত পরিমাণে খাবার, চিনিযুক্ত ডেজার্ট এবং প্রক্রিয়াজাত শর্করা (রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট) শরীরে অতিরিক্ত শক্তির জোগান দেয়, যা লিভারে চর্বি জমার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাতের খাবার সুষম হওয়া উচিত এবং খাওয়ার পর ঘুমানোর আগে কিছুটা সময় বিরতি রাখা উচিত; এটি একটি স্বাস্থ্যকর রুটিন গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
ফলের রসকে স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে গণ্য করা
ফলের সুনাম রয়েছে স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে, তাই প্যাকেটজাত ফলের রসকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়ার একটি সহজ উপায় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আস্ত ফলের তুলনায় ফলের রসে আঁশ (ফাইবার) অনেক কম থাকে এবং অনেক পণ্যে বাড়তি চিনি মেশানো থাকে। চিনিযুক্ত পানীয় ঘনঘন পান করলে শরীরে ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যায়, অথচ কঠিন খাবারের মতো এগুলো খেলে পেট ভরা অনুভূত হয় না।
অতিরিক্ত চিনি- বিশেষ করে যখন সামগ্রিক ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণও বেশি থাকে, লিভারে চর্বি জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আস্ত ফল রাখা অনেক বেশি ভালো। মিষ্টি পানীয়ের একটি ভালো বিকল্প হতে পারে পানি।
কিছুক্ষণ ব্যায়াম করা কিন্তু সারাদিন বসে থাকা
সকালে হাঁটা বা জিমে ব্যায়াম করা অবশ্যই ভালো, তবে সারাদিনের বেশিরভাগ সময় বসে থাকার নেতিবাচক প্রভাব এতে দূর হয় না। দীর্ঘক্ষণ নিষ্ক্রিয় থাকলে তা ইনসুলিন সংবেদনশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং শরীর কীভাবে গ্লুকোজ ও চর্বি প্রক্রিয়াজাত করবে, তাতেও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ফলে যকৃতে (লিভারে) অতিরিক্ত চর্বি জমা হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার মাঝে মাঝে অল্প হাঁটা, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা কাজের ফাঁকে নড়াচড়া করা সহায়ক হতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে ব্যায়াম করা ছেড়ে দিতে হবে; বরং ব্যায়ামকেই দিনের একমাত্র শারীরিক সক্রিয়তা হিসেবে গণ্য করার অভ্যাসটি পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
মাত্র পাঁচ ঘণ্টা ঘুমানো
নিয়মিত অপর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ, গ্লুকোজের ভারসাম্য এবং শরীরের অন্যান্য বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিবর্তনগুলো স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং শরীরের শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন করে তুলতে পারে। ঘুমের সমস্যা বিপাকীয় ত্রুটির সঙ্গেও সম্পর্কিত, যা ফ্যাটি লিভার রোগের কারণ হতে পারে। এর মানে এই নয় যে, কোনো এক রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে না পারলেই লিভারের ক্ষতি হবে; বরং বারবার অপর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাসই উদ্বেগের বিষয়। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানোর লক্ষ্য রাখা একটি ভালো সূচনা হতে পারে।
স্বাভাবিক ওজন মানেই লিভার সুস্থ- এমন ধারণা ভুল
শরীরের গঠন চিকন হলেই যে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি নেই, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। দক্ষিণ এশীয়সহ অনেক মানুষের ক্ষেত্রে বডি মাস ইনডেক্স (BMI) স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে। এই ভিসেরাল ফ্যাট বা অভ্যন্তরীণ চর্বি বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় থাকে এবং এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও বিভিন্ন বিপাকীয় রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই কেবল ওজনের দিকে নজর না দিয়ে কোমরের মাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা, রক্তের লিপিড (চর্বি) এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য নির্দেশকগুলোর দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। মনে রাখা প্রয়োজন যে ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ সবসময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। একজন ব্যক্তিকে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মনে হলেও তার শরীরে দীর্ঘস্থায়ী বিপাকীয় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
লিভারকে সুরক্ষিত রাখতে কী করা যেতে পারে?
আশার কথা হলো, ফ্যাটি লিভার রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে জীবনযাত্রায় টেকসই পরিবর্তনের মাধ্যমে অবস্থার উন্নতি ঘটানো সম্ভব। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ, সুষম খাবার গ্রহণ, মিষ্টি পানীয়ের পরিমাণ কমানো, পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া- এ সবকিছুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, পেটের মেদ বা অন্যান্য বিপাকীয় ঝুঁকির কারণ রয়েছে, তাদের লিভারের অবস্থা সম্পর্কে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা উচিত। স্বাভাবিক ওজন এবং অ্যালকোহল গ্রহণ না করা মানেই যে রোগ থাকবে না এমনটি নয়; তাছাড়া সবার জন্য একই ধরনের স্ক্রিনিং পরীক্ষার প্রয়োজনও হয় না।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.