প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫:৫৯ (বুধবার)
সিলেট হাই-টেক পার্ক ৩৩৬ কোটি টাকার বিনিয়োগ খরা,কর্মসংস্থান ৩৫০

সিলেট হাই-টেক পার্ক ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঘিরে স্বপ্ন ছিল বিপুল বিনিয়োগ ও ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের। প্রত্যাশা ছিল প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের মাধ্যমে সিলেটকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার। কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়নি। গ্যাসসংযোগের অভাব, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় সম্ভাবনাময় এ প্রকল্পে বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৩০০ কোটি টাকার মতো। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৩৫০ জনের।

সিলেট নগরী থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত হাই-টেক পার্কটিতে জায়গা বরাদ্দ পেয়েছিল ১৪টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছিল র‍্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড ও আপস্কিল বাংলাদেশ। তবে আপস্কিল বাংলাদেশ তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে। বর্তমানে পার্কটিতে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রয়েছে কেবল র‍্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে প্রতিষ্ঠানটিও প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদন সম্প্রসারণ করতে পারছে না।

৩৩৬ কোটি টাকার প্রকল্প, অব্যবহৃত বিপুল জমি
সিলেটের অর্থনীতিকে শিল্পায়িত করা, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের মার্চে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পার্কটি ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাই-টেক পার্ক’ নামে উদ্বোধন করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এর নাম পরিবর্তন করে ‘হাই-টেক পার্ক, সিলেট’ রাখা হয়।

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের (বিএইচটিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, পার্কটির প্রায় ৪৪ একর জমি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখনো ৭৬ একরের বেশি জমি অব্যবহৃত রয়েছে।

এ ছাড়া পার্কের প্রশাসনিক ভবনে বরাদ্দযোগ্য ২১ হাজার ৫৭৬ বর্গফুট জায়গার মধ্যে ১৯ হাজার ৬২ বর্গফুট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে জায়গা পাওয়া পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটিই এখনো কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।

জমি বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে র‍্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড তাদের ৩২ একর জমিতে অবকাঠামো নির্মাণ শেষে ২০২৫ সাল থেকে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে। অন্যদিকে, এডিএন টেকনোলজিস্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ শুরু করেও তা স্থগিত রেখেছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান এখনো নির্মাণকাজ শুরু করেনি।

গ্যাসসংযোগের অভাবে আটকে উৎপাদন সম্প্রসারণ
হাই-টেক পার্কে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিল্পকারখানার জন্য গ্যাসসংযোগ না পাওয়া। র‍্যাংগস ইলেকট্রনিক্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে শিল্পভিত্তিক গ্যাসসংযোগের জন্য আবেদন করে। কিন্তু বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। পরে বিএইচটিপিএর মাধ্যমে ২০২৫ সালের নভেম্বরে পুনরায় আবেদন করা হলেও সেটিও নাকচ হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে কর্তৃপক্ষ আবার আবেদন করেছে। এখনো সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

র‍্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, নিজেদের জমিতে কারখানা স্থাপনের সুযোগ থাকলেও হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রেখে তারা এখানে বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু শুরু থেকেই ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি বলেন, “আমাদের অন্যান্য প্রকল্পের মতো ব্যক্তিগতভাবে সংশ্লিষ্ট অফিসে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়েছে।”

ভাড়া নির্ধারণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগ তুলে রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিশ্রুতি ছিল, তিন বছরের নির্মাণকালে কোনো ভাড়া নেওয়া হবে না এবং ব্রেক-ইভেন পয়েন্টে না পৌঁছানো পর্যন্ত ভাড়া যৌক্তিক রাখা হবে। অথচ প্রথম দিন থেকেই আমাদের ভাড়া দিতে হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “কোনো বিকল্প বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। রক্ষণাবেক্ষণের কাজের সময় দিনের পর দিন উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। সবচেয়ে বড় বাধা গ্যাসসংযোগ। নির্মাণকাজ শুরু করার পর থেকেই মন্ত্রণালয় বারবার আমাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে আসছে।”

র‍্যাংগসের পরিকল্পনা ছিল টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনের লাইন চালু করা। কিন্তু গ্যাসসংযোগসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় শুধু রেফ্রিজারেটর উৎপাদন করছে বলে জানান তিনি।

রফিকুল ইসলামের দাবি, এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বছরে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ব্যাহত হচ্ছে কার্যক্রম
পার্কটিতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড পরিচালিত ৩৩/১১ কেভি লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে ভারী বর্ষণসহ বিভিন্ন কারণে সিলেটে প্রায়ই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে কারখানার উৎপাদন ও অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।

শিল্পকারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ হলেও পার্কটিতে এসব সুবিধার ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শহর থেকে দূরত্ব এবং পণ্য পরিবহনে বাড়তি ব্যয়।

বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ, বরাদ্দ বাতিলের উদ্যোগ
সিলেট হাই-টেক পার্কের উপপরিচালক মো. মাহফুজুল কবির বলেন, বর্তমানে পার্কে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু থাকা একমাত্র প্রতিষ্ঠান র‍্যাংগস ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি তাদের কারখানা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। এডিএন টেকনোলজিস্ট তাদের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ করছে। অন্যদিকে, আপস্কিল বাংলাদেশ জায়গা বরাদ্দ নিলেও তা ছেড়ে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, “পার্কে মোট ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। যারা এখনো কাজ শুরু করেনি, তাদের তাগিদপত্র পাঠানো হচ্ছে। যারা প্রকৃতপক্ষে কাজ করবে না, তাদের বরাদ্দ বাতিল করা হবে।”

পার্কটির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে উপপরিচালক বলেন, শহর থেকে দূরত্ব ও গ্যাস সুবিধার অভাব বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় বাধা। এ ছাড়া পার্কটি প্রান্তিক এলাকায় হওয়ায় ঢাকা বা দেশের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত কারখানার তুলনায় পণ্য পরিবহন ও সরবরাহে ব্যয় অনেক বেশি হচ্ছে।

গ্যাসসংযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ সুবিধা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী নীতিনির্ধারণী সভায় বিষয়টি সমাধানের জন্য আলোচনা করা হবে।

সম্ভাবনা থাকলেও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত হাই-টেক পার্কে বর্তমানে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৩৫০ জনের। প্রত্যাশিত বিনিয়োগের তুলনায় বাস্তব বিনিয়োগও অনেক কম। বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোর বড় অংশ অব্যবহৃত থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মো. মাহফুজুল কবিরের আশা, গ্যাসসংযোগ নিশ্চিত করা এবং নীতিগত ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে পার্কটিতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে দ্রুত গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগকারীদের প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যক্রম শুরুতে কার্যকর সহায়তা দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সিলেট হাই-টেক পার্কের সম্ভাবনা অব্যবহৃতই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।