প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৫৭ (বৃহস্পতিবার)
সুনামগঞ্জে দরপত্র ছাড়াই ২ বালুমহালের দখল বিএনপি নেতাকে দিল প্রশাসন

সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহাল দরপত্র ছাড়াই বিএনপি নেতা নাছির মিয়াকে বুঝিয়ে দিয়েছে প্রশাসন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ আদেশে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ বিবেচনায় আগামী ২০২৭ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত বালুমহাল দুটি থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি পেয়েছেন তিনি।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে বালুমহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। নাছির মিয়া তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তিনি সুনামগঞ্জ-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তাপস শীল বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নাছির মিয়াকে বালুমহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাতেই প্রশাসন এ পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে প্রকাশ্য দরপত্র ছাড়াই বিশেষ আদেশে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি যথাযথ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বালুমহালটির সাবেক এক ইজারাদার। তাঁর ভাষ্য, নিয়ম অনুযায়ী জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রকাশ্য দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া অথবা খাস আদায়ের ব্যবস্থা করার কথা। এ ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

যেভাবে ইজারা ও দখল নিয়ে জটিলতা
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল ১০৮ কোটি টাকায় ইজারা নেন জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমদ এবং মেসার্স তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের মালিক নাছির মিয়া। মামলা-সংক্রান্ত জটিলতায় ইজারা নেওয়ার পাঁচ মাস পর তাঁরা বালুমহাল দুটির দখল পান।

পরে ১৪৩২ বাংলা সন শেষ হওয়ার আগে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে আরও পাঁচ মাস বালু উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন দুই ইজারাদার। আদালত তাঁদের পক্ষে আদেশ দিলেও জেলা প্রশাসন এর বিরুদ্ধে আপিল করে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর আপিলের শুনানি শেষে রিটকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত নন বলে আদেশ হয়। এরপর বালুমহাল দুটিতে বালু উত্তোলন বন্ধের বিজ্ঞপ্তি দেয় জেলা প্রশাসন।

পরবর্তী সময়ে ১৪৩৩ বাংলা সনের অবশিষ্ট সময়ের জন্য খাস আদায়ের মাধ্যমে বালুমহাল দুটি পরিচালনার উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। এ বিষয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আহ্বান করা হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়।

এরই মধ্যে দুই ইজারাদার ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে অবশিষ্ট সময়ের জন্য বালু উত্তোলনের অনুমতি চান।

নাছিরকে অনুমতি, রাজস্ব নির্ধারণ ৪২ কোটি টাকা
গত ২২ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় এক আদেশে শুধু নাছির মিয়াকে বালুমহাল দুটি থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়। আদেশ অনুযায়ী, গত তিন বছরের গড় বাজারমূল্যের ওপর অতিরিক্ত ১২ শতাংশ হারে দর নির্ধারণ করে বালু উত্তোলন করতে হবে। অবশিষ্ট সময়ের জন্য বালুমহাল দুটির রাজস্ব নির্ধারণ করা হয় ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪২২ টাকা।

অনুমতি না পেয়ে শাহ রুবেল আহমদ নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওই আদেশ তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা হলে রিট আবেদন প্রত্যাহার করা হয়।

এরপর ১৫ অক্টোবর একই বিষয়ে বালুমহাল দুটির আরেক সাবেক ইজারাদার রতন মিয়া হাইকোর্টে রিট করেন। গত রোববার ওই রিটের কার্যকারিতা স্থগিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সোমবার নাছির মিয়াকে বালুমহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দেয় প্রশাসন।

প্রকাশ্য দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা না দিয়ে বিশেষ আদেশে দুটি বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয়ভাবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও ইজারা ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।