প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৩৪ (শুক্রবার)
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্মার্ট খাদ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশে খাদ্য অপচয় হ্রাস প্রয়োজন

অধ্যাপক ড. ইফতেখার আহমদ

প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খাদ্য শুধু মানুষের বেঁচে থাকার উপকরণ নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার, সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি এবং একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য “Innovate today. Nourish tomorrow.”—অর্থাৎ, ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’—খাদ্যব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই করে তোলার আহ্বান জানায়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই আহ্বান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ খাদ্য উৎপাদনে অগ্রগতি অর্জনের পাশাপাশি উৎপাদিত খাদ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

খাদ্য অপচয়: উৎপাদনের বাইরে একটি বড় সংকট

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। ধান, গম, আলু, শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, দুধ ও অন্যান্য কৃষিজাত খাদ্যপণ্য দেশের কোটি মানুষের জীবিকা ও পুষ্টির প্রধান উৎস। কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি, অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ, অনুপযুক্ত পরিবহন, শীতল সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ভোক্তা পর্যায়ে খাদ্য ফেলে দেওয়ার কারণে বিপুল খাদ্যসম্পদের অপচয় ঘটে।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা প্রয়োজন। খাদ্যক্ষতি (Food Loss) সাধারণত উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহের প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটে। অন্যদিকে খাদ্য অপচয় (Food Waste) বলতে মূলত খুচরা বিক্রয়, খাদ্য পরিবেশন ও ভোক্তা পর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য খাদ্য ফেলে দেওয়াকে বোঝায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উভয় সমস্যাই গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্য অপচয় শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পানি, জমি, জ্বালানি, সার, শ্রম ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার। উৎপাদিত খাদ্য নষ্ট হলে সেই খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত সম্পদও কার্যত নষ্ট হয়। পচনশীল জৈব বর্জ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে পচে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বাড়াতে পারে। ফলে খাদ্য অপচয় হ্রাস করা একই সঙ্গে পুষ্টি নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির একটি কার্যকর কৌশল।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: খাদ্যব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে পূর্বাভাস দেওয়া, ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে। খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার থালা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে এ প্রযুক্তির ব্যবহার খাদ্যক্ষতি কমাতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে।

প্রথমত, AI-ভিত্তিক পূর্বাভাসের মাধ্যমে আবহাওয়া, ফসলের উৎপাদন, বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন পণ্য কখন, কোথায় এবং কত পরিমাণে বাজারজাত করা প্রয়োজন, তা নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যায়। এতে অতিরিক্ত উৎপাদন, বাজারে পণ্যের উদ্বৃত্ত এবং অবিক্রীত খাদ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।

দ্বিতীয়ত, স্মার্ট সেন্সর, ইন্টারনেট অব থিংস এবং স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ব্যবহার করে গুদাম, হিমাগার ও পরিবহনযানে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং সংরক্ষণকাল পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। নির্ধারিত সীমার বাইরে তাপমাত্রা চলে গেলে সতর্কসংকেত দেওয়া যায়। মাছ, মাংস, দুধ, ফলমূল ও শাকসবজির মতো দ্রুত পচনশীল খাদ্যের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।

তৃতীয়ত, কম্পিউটার ভিশন ও মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে ফলের পরিপক্বতা, আকার, রং, দৃশ্যমান ত্রুটি এবং কিছু গুণগত বৈশিষ্ট্য দ্রুত শনাক্ত করা যায়। এতে কৃষিপণ্য বাছাই, শ্রেণিবিন্যাস ও প্রক্রিয়াজাতকরণ আরও নির্ভুল হতে পারে। তবে কোনো পণ্যের বাহ্যিক চেহারা দেখে একাই তার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না; প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা ও প্রতিষ্ঠিত মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।

চতুর্থত, আধুনিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি—যেমন উপযুক্ত তাপপ্রক্রিয়াকরণ, পাস্তুরাইজেশন, নিয়ন্ত্রিত শুকানো, হিমায়ন, উন্নত প্যাকেজিং এবং প্রয়োজনমাফিক অন্যান্য সংরক্ষণ পদ্ধতি—খাদ্যের নিরাপদ ব্যবহারকাল বাড়াতে পারে। AI এসব প্রক্রিয়ার সময়, তাপমাত্রা ও অন্যান্য নিয়ামক অপ্টিমাইজ করতে সহায়তা করতে পারে। তবে প্রযুক্তির নির্বাচন অবশ্যই খাদ্যের ধরন, নিরাপত্তা, পুষ্টিমান, ব্যয় ও স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় করণীয়

বাংলাদেশে খাদ্য অপচয় কমানোর জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি আমদানিই একমাত্র সমাধান নয়; বরং স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী সাশ্রয়ী, সহজে ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিকাশ জরুরি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষক, প্রান্তিক উৎপাদক, গ্রামীণ উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তিগত সুবিধার আওতায় আনতে হবে।

প্রথমত, উৎপাদন এলাকাভিত্তিক সৌরশক্তিচালিত শীতল সংরক্ষণাগার, উন্নত শুকানোর ব্যবস্থা এবং উপযোগী প্যাকেজিং প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বাজারদর, চাহিদা, সংরক্ষণ পদ্ধতি ও পরিবহনসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং খাদ্যশিল্পের যৌথ উদ্যোগে AI-ভিত্তিক পরীক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের কৃষকদের নিয়ে পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণাও দেখিয়েছে যে, কম ব্যয়ের প্রশিক্ষণ ও উন্নত ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা গ্রহণের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের ক্ষতি কমানো এবং কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।  এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাকে শিল্প ও বাজারের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড, মানসম্মত প্যাকেজিং, খাদ্যবর্জ্য পৃথকীকরণ এবং নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাদ্য বিতরণব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সরকারি প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।

নাগরিকের দায়িত্বও কম নয়

খাদ্য অপচয় রোধে শুধু সরকার বা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করলে চলবে না। পরিবারে প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য কেনা, সঠিকভাবে সংরক্ষণ, নিরাপদ অবশিষ্ট খাবার যথাসময়ে ব্যবহার এবং রেস্তোরাঁ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিমিত খাবার পরিবেশনের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বাজার, হোটেল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহারযোগ্য উদ্বৃত্ত খাদ্য নিরাপদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অভাবী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নষ্ট বা অনিরাপদ খাবার পুনর্বিতরণ না করে সেগুলোর নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশে খাদ্য অপচয় হ্রাসে ২০২৬ সালের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি উদ্যোগ

১. কৃষক কার্ড ও ডিজিটাল কৃষিসেবা সম্প্রসারণ: সরকার কৃষকদের নিবন্ধন, কৃষি পরামর্শ, আবহাওয়ার তথ্য, বাজারদর এবং কৃষি উপকরণে সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে কৃষক কার্ড ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব সেবা কার্যকর হলে উৎপাদন পরিকল্পনা ও বাজারসংযোগ উন্নত করে খাদ্যক্ষতি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

২. সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণক্ষমতা বৃদ্ধি: ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণক্ষমতা ৩৪ লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক গুদাম ও খাদ্যশস্য সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ রয়েছে। যথাযথ তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও গুণমান পর্যবেক্ষণ যুক্ত করা গেলে সংরক্ষণকালীন ক্ষতি আরও কমানো সম্ভব।

৩. ডিজিটাল খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও ‘কৃষকের অ্যাপ’: ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ডিজিটাল খাদ্য ব্যবস্থাপনা, খাদ্যশস্যের মজুত ও বাজারদর পর্যবেক্ষণ এবং ‘কৃষকের অ্যাপ’-এর মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের উদ্যোগ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে সংগ্রহ, মজুত ও বিতরণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে।

৪. জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতির খসড়া ও তথ্যভিত্তিক খাদ্য পরিকল্পনা: বাংলাদেশের National AI Policy 2026-2030 এর খসড়ায় কৃষিতে AI ব্যবহারের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে যেমন আবহাওয়া ও ফলন পূর্বাভাস, ফসলের রোগ শনাক্তকরণ এবং সম্পদের দক্ষ ব্যবহার। পাশাপাশি, খাদ্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও পরিকল্পনার জন্য Food Planning and Monitoring Committee পুনর্গঠন করা হয়েছে।

প্রযুক্তি হোক মানুষের পুষ্টির হাতিয়ার

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ শুধু বেশি খাদ্য উৎপাদন নয়; বরং উৎপাদিত খাদ্যের প্রতিটি অংশের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। খাদ্য অপচয় কমানো গেলে কৃষকের ন্যায্য আয় বাড়বে, ভোক্তার ব্যয় কমবে, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ হ্রাস পাবে এবং পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা উন্নত হবে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। নির্ভরযোগ্য তথ্য, দক্ষ জনশক্তি, উপযুক্ত অবকাঠামো, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা ছাড়া এর সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না। তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভরতার পাশাপাশি স্থানীয় জ্ঞান, কৃষকের অভিজ্ঞতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের সমন্বয়।

বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬-এ আমাদের অঙ্গীকার হোক—খাদ্য উৎপাদনে উদ্ভাবন, সংরক্ষণে বিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি এবং খাদ্য ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা। আজ যে প্রযুক্তি, জ্ঞান ও সচেতনতা আমরা গড়ে তুলব, তা-ই আগামী দিনের ক্ষুধামুক্ত, পুষ্টিসমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশ নির্মাণের ভিত্তি হবে। কারণ খাদ্য অপচয় রোধ মানে শুধু খাবার বাঁচানো নয়; এটি কৃষকের শ্রম, দেশের সম্পদ, পরিবেশ এবং মানুষের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। এটাই হোক ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’ প্রতিপাদ্যের বাস্তব প্রতিফলন।

 

 

লেখক: অধ্যাপক ড. ইফতেখার আহমদ

ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি বিভাগ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট, বাংলাদেশ