জন্মনিবন্ধন নম্বর ‘জালিয়াতির’ শিকার আলিমপড়ুয়া, একই নম্বরে দুবার অন্যের পাসপোর্ট নিজের বৈধ জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে পাসপোর্ট করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন সিলেটের ওসমানীনগরের আলিমপড়ুয়া ছাত্র মো. আবু সাঈদ।
তার জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে মো. মাকনুন’ নামে এক ব্যক্তির নামে ২০১৮ ও ২০২৩ সালে দুটি পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে। মাকনুন বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।
নিজের জন্মনিবন্ধন সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও পাসপোর্ট করতে না পেরে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পাসপোর্ট কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ঘুরছেন আবু সাঈদ ও তার বাবা মো. শফিকুর রহমান।
আবু সাঈদ সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার ওসমানপুর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণশাসন এলাকার বাসিন্দা। গত ২৭ সেপ্টেম্বর নিজের জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে পাসপোর্টের আবেদন করেন তিনি। আবেদন জমা দেওয়ার পর নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষে ছবি ও আঙুলের ছাপ দিতে গেলে পাসপোর্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ওই জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে এরই মধ্যে অন্য একজনের নামে দুটি পাসপোর্ট করা হয়েছে।
শফিকুর রহমান জানান, পাসপোর্ট কার্যালয় থেকে তাকে বলা হয়, তার ছেলে আবু সাঈদের জন্মনিবন্ধন নম্বর দিয়ে ‘মো. মাকনুন’ নামে দুটি পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে। প্রথম পাসপোর্টটি ২০১৮ সালে এবং পরবর্তীটি ২০২৩ সালে করা হয়।
বিষয়টি জানার পর তিনি ওসমানপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আবু সাঈদ ও মো. মাকনুনের জন্মনিবন্ধনের অনলাইন কপি সংগ্রহ করেন। দুটি নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের জন্মনিবন্ধন নম্বর আলাদা। এমনকি দুই ব্যক্তির বাবা-মায়ের নামও ভিন্ন।
আবু সাঈদের জন্মনিবন্ধন নম্বরের শেষ পাঁচ সংখ্যা ২৬৩৮৫। তার জন্মনিবন্ধনে বাবার ও মায়ের নাম সঠিকভাবে উল্লেখ রয়েছে। নথিটি ওসমানপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ইস্যু করা। এর রেজিস্ট্রেশনের তারিখ ২০০৯ সালের ৪ মার্চ এবং ইস্যুর তারিখ ২০২১ সালের ৪ জুন।
অন্যদিকে মো. মাকনুনের জন্মনিবন্ধন নম্বরের শেষ পাঁচ সংখ্যা ১১৪৯০। তার বাবার নাম মো. শুয়াইবুর রহমান এবং মায়ের নাম মোছাম্মৎ আবিদা খাতুন। এই জন্মনিবন্ধনের রেজিস্ট্রেশনের তারিখ ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল এবং ইস্যুর তারিখ ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল।
অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদের নথি অনুযায়ী, আবু সাঈদ ও মাকনুনের জন্মনিবন্ধন নম্বর সম্পূর্ণ আলাদা। এমনকি আবু সাঈদের জন্মনিবন্ধনের রেজিস্ট্রেশন ও ইস্যুর তারিখও মাকনুনের নথির চেয়ে আগের।
তবে পাসপোর্ট-সংক্রান্ত নথিতে দেখা গেছে, আবু সাঈদের জন্মনিবন্ধন নম্বরের শেষ পাঁচ সংখ্যা ২৬৩৮৫ ব্যবহার করে মো. মাকনুনের নামে পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে। সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস থেকে ইস্যু করা ওই পাসপোর্টের নম্বরের শেষ তিন সংখ্যা ১৯৩।
এরপর একই জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে মাকনুনের নামে আরও একটি পাসপোর্ট করা হয়। ওই পাসপোর্টের নম্বরের শেষ তিন সংখ্যা ৪২৭। পাসপোর্টটি ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি ইস্যু করা হয় এবং এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের ২৯ জানুয়ারি।
‘ভুল আমাদের নয়, নতুন জন্মনিবন্ধন কেন করব’
ছেলের পাসপোর্টের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা কার্যালয়ের উপপরিচালকের কাছে যান শফিকুর রহমান। তার দাবি, সেখানে তাকে বলা হয়, বিষয়টি পাসপোর্ট অফিসের নয়; এটি ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
পরে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দুই ব্যক্তির আলাদা জন্মনিবন্ধনের কাগজপত্র সংগ্রহ করে আবার পাসপোর্ট কার্যালয়ে যান তিনি। তখন তাকে বলা হয়, প্রয়োজনীয় যাচাই ছাড়া আগে পাসপোর্ট হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই ভুল আমাদের নয়। আমি কেন এখন নতুন জন্মনিবন্ধন করব? আমার মূল কাগজপত্র কেন আমি আবার পরিবর্তন বা ডুপ্লিকেট করব?’
তিনি বলেন, ছেলের বৈধ জন্মনিবন্ধন থাকা সত্ত্বেও অন্য একজন কীভাবে সেই নম্বর ব্যবহার করে দুবার পাসপোর্ট পেলেন, সেটি তদন্ত করে দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।
‘ইউনিয়ন পরিষদের নথিতে কোনো সমস্যা নেই’
অভিযোগের বিষয়ে ওসমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোবিন্দ চন্দ্র দেব বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের নথিতে আবু সাঈদ ও মো. মাকনুনের জন্মনিবন্ধন নম্বর আলাদা।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়ন থেকে কোনো সমস্যা নেই। দুইজনের জন্মনিবন্ধনের নম্বরও আলাদা। এটা কেন, কীভাবে হলো, সেটি পাসপোর্ট অফিস বলতে পারবে।’
তিনি জানান, এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র ভুক্তভোগীকে দেওয়া হয়েছে।
পাসপোর্ট অফিসের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ নুরুল হুদার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রথমবার পাসপোর্ট করার সময় পুলিশ ভেরিফিকেশনের ব্যবস্থা ছিল। ওই সময়ের পুলিশ প্রতিবেদন দেখে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে।
মো. মাকনুন বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পাসপোর্ট আবেদনে দেওয়া একটি ফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
নিজের জন্মনিবন্ধন নম্বর অন্যের পাসপোর্টে ব্যবহারের ঘটনায় এখন আবু সাঈদ ও তার পরিবারের দাবি—বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা এবং তার পাসপোর্ট পাওয়ার জটিলতা দূর করা হোক।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.