প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:০১ (রবিবার)
নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাসে কমতে পারে মস্তিষ্কের বার্ধক্য, বলছে গবেষণা

ছবি: সংগৃহীত

ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক একটি খাদ্য পরিকল্পনার সমন্বয়ে তৈরি ‘মাইন্ড’ ডায়েট মস্তিষ্কের বয়সজনিত কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন কমাতে পারে। নতুন এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। 

‘জার্নাল অব নিউরোলজি, নিউরোসার্জারি অ্যান্ড সাইকিয়াট্রি’তে অনলাইনে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, মাইন্ড ডায়েট যত বেশি মেনে চলা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের টিস্যু ক্ষয় তত কম দেখা গেছে। বিশেষ করে ধূসর পদার্থ বা গ্রে ম্যাটারের ক্ষয় কম ছিল। মস্তিষ্কের এই অংশ স্মৃতি, শেখা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এ ছাড়া মাইন্ড ডায়েট মস্তিষ্কের ভেন্ট্রিকলের আকার বাড়ার গতি কমার সঙ্গেও সম্পর্কিত ছিল। ভেন্ট্রিকল হলো মস্তিষ্কের ভেতরের তরলপূর্ণ স্থান, যা মস্তিষ্কের টিস্যু সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত বড় হতে থাকে।

কী এই মাইন্ড ডায়েট?

মাইন্ড শব্দটি এসেছে ‘মেডিটেরেনিয়ান-ডায়েটারি অ্যাপ্রোচেস টু স্টপ হাইপারটেনশন ডায়েট ইন্টারভেনশন ফর নিউরোডিজেনারেটিভ ডিলে’ থেকে। গবেষকদের মতে, আগের গবেষণাগুলোতেও এই খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে উন্নততর জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

মাইন্ড ডায়েটে সবুজ পাতাযুক্ত শাকসবজি, অন্যান্য সবজি, বেরি জাতীয় ফল, বাদাম, পূর্ণ শস্য, মাছ, শিমজাতীয় খাবার, অলিভ অয়েল ও মুরগির মাংসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি পরিমিত ওয়াইন গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। 

অন্যদিকে মাখন বা মার্জারিন, চিজ, লাল মাংস, পেস্ট্রি ও মিষ্টি এবং ভাজা ফাস্টফুড সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

মাইন্ড ডায়েটের সঙ্গে জ্ঞানীয় স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর এর প্রভাব এতটা স্পষ্ট ছিল না। এসব কাঠামোগত পরিবর্তন আলঝেইমার ও পারকিনসন রোগের মতো নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বছরের পর বছর মস্তিষ্কের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ

এ বিষয়ে গবেষকেরা ফ্রেমিংহাম হার্ট স্টাডির অফসপ্রিং কোহর্টের ১ হাজার ৬৪৭ জন মধ্যবয়সি ও বয়স্ক ব্যক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করেন। গবেষণা শুরুর সময় তাদের গড় বয়স ছিল ৬০ বছর। 

অংশগ্রহণকারীদের প্রতি চার থেকে আট বছর পরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। ১৯৯৯ সাল থেকে তাদের মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যানও করা হয়, যা নেওয়া হয়েছিল প্রতি দুই থেকে ছয় বছর পরপর।

১৯৯১-৯৫, ১৯৯৫-৯৮ এবং/অথবা ১৯৯৮-২০০১ সালের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় অন্তত একটি খাদ্যাভ্যাসসংক্রান্ত প্রশ্নপত্র পূরণ করেছিলেন অংশগ্রহণকারীরা। ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রত্যেকের অন্তত দুটি মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান ছিল। প্রথম এমআরআইয়ের সময় তাদের স্ট্রোক বা ডিমেনশিয়ার কোনো প্রমাণ ছিল না।

মাইন্ড ডায়েট অনুসরণের গড় স্কোর ছিল ১৫-এর মধ্যে ৭-এর কিছু কম। এখানে ১৫ স্কোরকে এই খাদ্যাভ্যাস সবচেয়ে বেশি অনুসরণের নির্দেশক হিসেবে ধরা হয়।

মাইন্ড ডায়েট অনুসরণে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও কলেজশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেশি ছিল। তাদের ধূমপান ও স্থূলতার হারও তুলনামূলক কম ছিল।

এ ছাড়া টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের মতো মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে এমন রোগও তাদের মধ্যে কম ছিল। 

গড়ে ১২ বছর ধরে পর্যবেক্ষণের সময় এমআরআই স্ক্যানে বয়সজনিত প্রত্যাশিত পরিবর্তন দেখা যায়। এর মধ্যে ছিল মস্তিষ্কের মোট আয়তন, ধূসর পদার্থ, সাদা পদার্থ ও হিপোক্যাম্পাসের আয়তন কমে যাওয়া।

একই সময়ে মস্তিষ্ক ও ভেন্ট্রিকলে থাকা সেরিব্রোস্পাইনাল তরলের পরিমাণ এবং ভেন্ট্রিকলের আয়তন বেড়েছে। এমআরআইতে উজ্জ্বল দাগ হিসেবে দেখা যায় এমন সাদা পদার্থের হাইপারইনটেনসিটিও বেড়েছে, যা টিস্যু ক্ষতির ইঙ্গিত দিতে পারে।

তবে যাদের মাইন্ড ডায়েট স্কোর বেশি ছিল, তাদের ধূসর পদার্থের ক্ষয় তুলনামূলক ধীর ছিল।

মাইন্ড ডায়েটের স্কোরে প্রতি ৩ পয়েন্ট বৃদ্ধির সঙ্গে প্রতি বছর ধূসর পদার্থের ক্ষয় ০.২৭৯ ঘন সেন্টিমিটার কম হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকদের হিসাবে, এর অর্থ বয়সজনিত ক্ষয় প্রায় ২০ শতাংশ কম এবং মস্তিষ্কের বার্ধক্য প্রায় আড়াই বছর বিলম্বিত হওয়ার সমতুল্য।

ভেন্ট্রিকলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্পর্ক দেখা গেছে। মাইন্ড ডায়েট স্কোরে প্রতি ৩ পয়েন্ট বৃদ্ধির সঙ্গে মোট ভেন্ট্রিকলের আয়তন বৃদ্ধির হার প্রতি বছর ০.০৭১ ঘন সেন্টিমিটার কম ছিল। গবেষকদের হিসাবে, এটি টিস্যু ক্ষয় প্রায় ৮ শতাংশ কম এবং প্রায় এক বছর মস্তিষ্কের বার্ধক্য বিলম্বিত হওয়ার সমতুল্য।

গবেষণায় কিছু খাবারের সঙ্গে এই ইতিবাচক সম্পর্ক তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। 

বেরি জাতীয় ফল বেশি খাওয়ার সঙ্গে ভেন্ট্রিকলের আয়তন বৃদ্ধির হার কম হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মুরগির মাংসের ক্ষেত্রেও ভেন্ট্রিকল বড় হওয়ার গতি ধীর হওয়ার পাশাপাশি ধূসর পদার্থের ক্ষয় কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়।

অন্যদিকে বেশি মিষ্টি খাওয়ার সঙ্গে ভেন্ট্রিকল দ্রুত বড় হওয়া এবং হিপোক্যাম্পাসের বেশি ক্ষয়ের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ভাজা ফাস্টফুড বেশি খাওয়ার সঙ্গেও হিপোক্যাম্পাসের আয়তন বেশি কমার সম্পর্ক ছিল।

গবেষকদের মতে, বেরির মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার এবং মুরগির মাংসের মতো উচ্চমানের প্রোটিন অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমিয়ে স্নায়ুকোষের ক্ষতি কমাতে পারে। বিপরীতে, ভাজা ফাস্টফুডে অস্বাস্থ্যকর চর্বি, ট্রান্স ফ্যাট ও অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন এন্ড প্রোডাক্ট বেশি থাকায় তা প্রদাহ ও রক্তনালির ক্ষতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সব খাবারের ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।

বেশি পূর্ণ শস্য গ্রহণের সঙ্গে ধূসর পদার্থ ও হিপোক্যাম্পাসের আয়তন দ্রুত কমে যাওয়া এবং ভেন্ট্রিকল দ্রুত বড় হওয়ার মতো কয়েকটি নেতিবাচক কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

চিজের ক্ষেত্রে আবার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। বেশি চিজ খাওয়ার সঙ্গে ধূসর পদার্থ ও হিপোক্যাম্পাসের আয়তন কমার গতি ধীর হওয়া, ভেন্ট্রিকল কম বড় হওয়া এবং সাদা পদার্থের হাইপারইনটেনসিটি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

বয়স্কদের ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী

বিভিন্ন অতিরিক্ত বিশ্লেষণেও সামগ্রিক সম্পর্কগুলো মোটামুটি একই ছিল এবং বয়স্ক অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এসব সম্পর্ক আরও শক্তিশালী দেখা গেছে। 

গবেষকদের মতে, এর অর্থ হতে পারে দ্রুত মস্তিষ্কের বার্ধক্যের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য মাইন্ড ডায়েট বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। মস্তিষ্কের ক্ষয়ের গতি যাদের মধ্যে বেশি তারতম্য রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব থাকতে পারে।

যারা বেশি শারীরিকভাবে সক্রিয় ছিলেন এবং যাদের অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা ছিল না, তাদের মধ্যেও মাইন্ড ডায়েটের সঙ্গে মস্তিষ্কের কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্পর্ক তুলনামূলক বেশি ছিল।

গবেষকদের মতে, মস্তিষ্কের জন্য উপকারী খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অন্যান্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন পদ্ধতি যুক্ত করলে নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

কারণ-ফল নিশ্চিত করতে পারেনি গবেষণা

তবে এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। ফলে মাইন্ড ডায়েট সরাসরি মস্তিষ্কের পরিবর্তনের গতি কমিয়েছে—এমন কারণ-ফল সম্পর্ক এই গবেষণা প্রমাণ করতে পারে না।

গবেষকেরা আরও উল্লেখ করেছেন, খাদ্যাভ্যাসসংক্রান্ত প্রশ্নপত্রে অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের খাওয়ার তথ্য সঠিকভাবে মনে করে জানাতে হয়েছে। এতে তথ্য মনে করার ক্ষেত্রে ভুল বা ‘রিকল বায়াস’ তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া প্রথম এমআরআইয়ের সময় মৃদু জ্ঞানীয় দুর্বলতা ছিল কি না, সময়ের সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়েছে কি না কিংবা জেনেটিক ঝুঁকির প্রভাব কতটা ছিল—এসব বিষয় পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি।

গবেষণায় অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষই শ্বেতাঙ্গ হওয়ায় অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ক্ষেত্রে একই ফল সমানভাবে প্রযোজ্য কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তবু গবেষকদের উপসংহার হলো, এসব ফলাফল মাইন্ড ডায়েটকে মস্তিষ্কের জন্য উপকারী খাদ্যাভ্যাস হিসেবে বিবেচনার সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করে এবং বয়স্ক মানুষের নিউরোডিজেনারেশন ধীর করার কৌশলে এর ভূমিকার পক্ষে সমর্থন দেয়।