সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে পরিদর্শনে এসে সাত দিনের মধ্যে হাসপাতালের সব সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসাসেবা ও পরিচ্ছন্নতায় ‘দৃশ্যমান পরিবর্তন’ এসেছে বলে দাবি করলেও রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, বাস্তবে হাসপাতালের পরিবেশ কিংবা সেবার মানে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।
পরিচ্ছন্নতায় পরিবর্তন এসেছে কি না, তা দেখতে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ভবন ঘুরে সরেজমিনে দেখা যায়,
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার চিত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। জরুরি বিভাগ দিয়ে প্রবেশের পর নিচতলার বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক, পলিথিন ও পানের পিক পড়ে থাকতে দেখা যায়। সিঁড়ির বিভিন্ন কোণেও জমে আছে ময়লা-আবর্জনা ও পানের পিক।
হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার হৃদরোগ ওয়ার্ডে দেখা যায় রোগীদের উপচেপড়া ভিড়। ওয়ার্ডের বারান্দা ও মেঝেতেও বেড পেতে রোগীদের রাখা হয়েছে। বাথরুম থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। মেঝেতে জমে থাকা পানির সঙ্গে জুতার ধুলাবালি মিশে পিচ্ছিল হয়ে তৈরি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।
বাথরুমের পাশেই বেডে এবং মেঝেতে অবস্থান করছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। দুর্গন্ধের কারণে অনেককেই নাক-মুখ চেপে থাকতে দেখা যায়।
এ সময় দুপুরের খাবার বিতরণ করতেও দেখা যায়। খাবারের তালিকায় ছিল ভাত, মাঝারি আকারের এক টুকরো মুরগি ও সবজি।
হৃদরোগ ওয়ার্ডে এক রোগীর স্বজন বলেন, “বাথরুমের গন্ধের কারণে হাসপাতালে টেকা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় থাকলে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ হতে দেরি হবে। নিচে থাকা রোগীদের পাশ দিয়ে বাথরুমে যেতে হয়। কখনো কখনো মেঝেতে থাকা রোগীর বেডে পা লাগে অনেকের।”
সার্জারি ও গাইনি ওয়ার্ডেও একই চিত্র
১১ নম্বর ওয়ার্ডের পুরুষ সার্জারি বিভাগে অন্য ওয়ার্ডগুলোর তুলনায় রোগীর চাপ কিছুটা কম দেখা গেলেও ওয়ার্ডের মেঝে ও বাথরুমে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাথরুম থেকেও ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।
এ বিভাগে বড় ভাইকে নিয়ে তিন দিন ধরে হাসপাতালে থাকা এক ব্যক্তি জানান, তার ভাইয়ের অপারেশন হয়েছে।
তিনি বলেন, “সকালে ডাক্তার দেখে গেলে পরে প্রয়োজন পড়লে ডাক্তার ও নার্সদের বললে তারা আসেন। কোনো সময় একটু দেরিতে আসেন, কোনো সময় সঙ্গে সঙ্গে চলে আসেন। উনাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে আরকি।”
১৩ নম্বর ওয়ার্ডের গাইনি বিভাগেও দেখা গেছে একই চিত্র। দ্বিতীয় তলার লেবার ওটির বারান্দায় সদ্যোজাত শিশুকে নিয়ে বসে ছিলেন স্বজনরা। তাদের আশপাশেও পড়ে থাকতে দেখা যায় ময়লা-আবর্জনা।
একই ভবনে থাকা চিকিৎসকদের ক্যান্টিনের চারপাশের মেঝেতেও ময়লা, পানের পিক ও প্লাস্টিকের কাপ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
নতুন ভবনেও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ
হাসপাতালের নতুন ভবনের বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন তলায় চিকিৎসক দেখাতে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন রোগীরা। চিকিৎসাসেবা চালু থাকলেও ভবনজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের চিত্র।
ভবনটির তৃতীয় তলায় চর্ম-যৌন ও মানসিক বিভাগের ব্যালকনি সংলগ্ন টিনের ছাউনিতে জমে আছে ময়লার বিশাল স্তূপ।
অন্যদিকে, একই ভবনের পুরুষ মেডিসিন বিভাগে গিয়ে দেখা যায় বাথরুমগুলোর স্যাঁতসেঁতে ও জরাজীর্ণ অবস্থা। চারপাশ ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকার পাশাপাশি বাথরুমের ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, এমন পরিবেশে চিকিৎসা নিতে এসে তারা আরও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
নতুন ভবনের লিফটে ওঠার জন্য রোগী ও স্বজনদের জটলার মধ্যেই রোগীদের খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় খাবার বিতরণের দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তিকে।
খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ
চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগীদের সরবরাহ করা খাবারের মান ও পরিবেশন পদ্ধতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
নতুন ভবনের পুরুষ মেডিসিন বিভাগের এক রোগী বলেন, “দুপুরের খাবারে ভাত, এক টুকরো মুরগি আর এক হাতা সবজি দেওয়া হয়। তবে পরিচ্ছন্নতা না মেনে তারা মুরগি ও সবজি একসঙ্গেই ঢেলে দেয়। আলাদা করে দিতে চাইলে দিতে চায় না।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ) ডা. আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, “পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। ডাক্তাররাও ঠিক সময়ে হাসপাতালে আসেন। সকাল সাতটা থেকে আটটা পর্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে, তারপর ডাক্তাররা ওয়ার্ডে যান।”
তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর হাসপাতালের জনবল ও যন্ত্রপাতির চাহিদা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া নতুন ক্যানসার বিল্ডিং চালু করার জনবল চাহিদাও পাঠানো হয়েছে।”
তবে হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের পেছনে জনবল সংকটকে দায়ী করছেন এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, “বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২৬২ জন কর্মচারী দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। তবে এই হাসপাতালে এ কাজের জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ জন লোক দরকার।”
হাসপাতালের উপ-পরিচালক হুমায়ুন কবির বলেন, “হৃদরোগ ওয়ার্ডে রোগী থাকার কথা ৪০ জন, বর্তমানে আছেন ১২০ জন। রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পরও কিছুক্ষণ পরই আবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কয়েকবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় হাসপাতাল।”
তিনি বলেন, “৯০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও জনবল রয়েছে ৫০০ শয্যার জন্য। অথচ প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। বাথরুমের দরজা-জানালা সংস্কারের জন্য গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে।”
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.