পেট্রোবাংলার বৃহৎ কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের (এসজিএফএল) সিলেট-১০ নম্বর কূপ খনন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা। দুই দফায় প্রকল্পের ব্যয় ২০২ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫১৭ কোটি টাকা করা হলেও শেষ পর্যন্ত কূপটি থেকে কাঙ্ক্ষিতভাবে গ্যাস উৎপাদন সম্ভব হয়নি। বর্তমানে পানি ও বালু ওঠা এবং কূপমুখের চাপ কমে যাওয়ায় গ্যাস উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার আলীগাঁও ইউনিয়নের বাঘের সড়ক এলাকায় এসজিএফএলের সদর দপ্তরের কাছাকাছি অনুসন্ধানমূলক এই কূপটির অবস্থান। ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘সিলেট-১০ নম্বর কূপ খনন প্রকল্প’ অনুমোদন করা হয়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০২ কোটি টাকার কিছু বেশি। ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে, অর্থাৎ দুই বছর তিন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। পরে প্রকল্পটি সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে ৫১৭ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে সময় বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপরও কাজ শেষ না হওয়ায় আরও এক বছর সময় বাড়ানো হয়। সর্বশেষ বর্ধিত মেয়াদ গত ৩০ জুন শেষ হয়েছে।
অর্থাৎ প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত দুই বছর তিন মাসের পরিবর্তে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লেগেছে প্রায় চার বছর নয় মাস। এর মধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
নির্ধারিত গভীরতায় খনন হয়নি
প্রকল্পের আওতায় সিলেট-১০ ও সিলেট-১০ এক্স কূপ খননের পাশাপাশি গ্যাস গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণ, ৮ দশমিক ৪৮ একর ভূমি অধিগ্রহণ এবং বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের পরিকল্পনা ছিল।
২০১৮ সালের এসএলবি প্রতিবেদনে সিলেট-১০ কূপটি প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মিটার গভীর পর্যন্ত খননের প্রস্তাব করা হয়েছিল। ওই গভীরতায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল।
চীনের সিনোপেক ইন্টারন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম সার্ভিস করপোরেশনকে কূপ খননের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৩ সালের নভেম্বরে খননকাজ শুরু করে এবং পরবর্তী সময়ে প্রায় ২ হাজার ৫৭৬ মিটার পর্যন্ত খনন করে। তবে গ্যাসের উচ্চচাপের কারণে নির্ধারিত ৩ হাজার ৩০০ মিটার গভীরতায় কূপটি নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গ্যাসের সন্ধান মিললেও উৎপাদন টেকেনি
২০২৩ সালে কূপটির বিভিন্ন স্তরে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৪০ থেকে ২ হাজার ৫৭৫ মিটার গভীরতায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার তথ্য জানানো হয়েছিল। কূপটিতে গ্যাসের চাপও ছিল প্রায় ৩ হাজার ৪০০ পিএসআই।
চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোপেক ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কূপটির কমপ্লিশন কাজ শেষ করে। এরপর কূপ থেকে হরিপুর গ্যাসক্ষেত্রের প্রসেস প্ল্যান্ট পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৪ ইঞ্চি ব্যাসের উচ্চচাপ গ্যাস গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়।
পাইপলাইন নির্মাণ শেষে ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল কূপটি থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। সে সময় কূপটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
কিন্তু উৎপাদন শুরুর পর কূপ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি ও বালু উঠতে শুরু করে। একই সঙ্গে কূপমুখের চাপও কমে যায়। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কূপটির গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন প্রকল্প পরিকল্পনা ও তদারকি নিয়ে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের অনুসন্ধানমূলক প্রকল্প নেওয়ার আগে কারিগরি সম্ভাব্যতা ও ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তদারকি ও কারিগরি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং ভূতাত্ত্বিক ও কারিগরি তথ্যের সমন্বিত মূল্যায়ন করা জরুরি। তাদের অভিযোগ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ও সময় দুটিই বেড়েছে।
তবে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুল কাদের ভূঁইয়া বলেন, কূপের উচ্চচাপের কারণেই নির্ধারিত গভীরতা পর্যন্ত খনন করা সম্ভব হয়নি। তার মতে, মাটির নিচে কূপ খননে ব্যয় করা অর্থ প্রত্যাশিতভাবে কাজে না এলেও পাইপলাইনসহ অন্যান্য অবকাঠামো ভবিষ্যতে সিলেট-১০ এক্স কূপ খননের কাজে ব্যবহার করা যাবে।
পিইসি সভায় সংশোধিত ডিপিপি
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ জুন প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠাতে বলা হয়। পরবর্তীতে সংশোধিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ৬ জুলাই তা অনুমোদন করেন।
এরপর নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অবহিত করার জন্য গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়।
সিলেট-১০ কূপকে ঘিরে শুরুতে গ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ তৈরি হলেও উৎপাদন শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই পানি ও বালু ওঠা এবং চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রায় ৪৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির প্রত্যাশিত সুফল কতটা পাওয়া গেল এবং প্রকল্প পরিকল্পনা, তদারকি ও কারিগরি সিদ্ধান্তে কোনো ঘাটতি ছিল কি না—তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.