বিশ্বের পর্যটনশিল্প যখন প্রযুক্তিনির্ভর ও স্মার্ট ব্যবস্থাপনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো এখনো মৌলিক সেবার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। দিন দিন পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। নিরাপত্তা, যোগাযোগ, চিকিৎসা, মোবাইল নেটওয়ার্ক, আবাসন ও প্রশিক্ষিত গাইডের সংকট রয়েছে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে। কোথাও জরুরি চিকিৎসা বা ফায়ার সার্ভিস নেই, কোথাও নেই ডুবুরি দল। আবার কোনো কোনো স্থানে যাতায়াতব্যবস্থাই পর্যটকদের ভোগান্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর পাশাপাশি রয়েছে পরিবেশদূষণ, অপরিকল্পিত স্থাপনা, অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ। ফলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ সিলেট পর্যটকদের আকর্ষণ করলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের কারণে দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত সিলেট। পাহাড়-টিলা, ঝরনা, নদী, পাথর ও সবুজ চা-বাগানের টানে সারা বছরই এখানে আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির দিনে জাফলং, সাদাপাথর, বিছনাকান্দি, রাতারগুল ও লালাখালে নামে পর্যটকের ঢল। এ সময় হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোও প্রায় পূর্ণ হয়ে যায়।
পর্যটকদের ঘিরে সিলেটে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের কর্মসংস্থান। পরিবহন, নৌযান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও গাইডিং পেশায় যুক্ত হয়েছেন হাজারো মানুষ। পর্যটকদের ব্যয়ের মাধ্যমে সচল হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতিও। তবে পর্যটকের চাপ বাড়লেও পর্যটনসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও সেবার মান সেই অনুপাতে বাড়েনি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
বিছনাকান্দি এলাকার একাধিক বাসিন্দা বলেন, যাতায়াতব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে অনেক পর্যটক একবার ঘুরে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার সেখানে যেতে চান না। তাঁদের মতে, যোগাযোগের দুর্ভোগ পর্যটন বিকাশের অন্যতম বড় বাধা।
সিলেটের তরুণ উদ্যোক্তা তুহিন আহমদ বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে গড়ে তুলছে। বাংলাদেশেরও এ খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে সিলেটে। কার্যকর পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন থেকে দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখা সম্ভব।
ভ্রমণপ্রেমী ও পর্যটন ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির লিটন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র যখন ‘স্মার্ট ডেস্টিনেশনে’ রূপ নিচ্ছে, তখন সিলেটের জাফলং ও সাদাপাথরের মতো জনপ্রিয় স্থানেও পর্যটকদের মোবাইল নেটওয়ার্ক নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। তাঁর মতে, এটি পর্যটন ব্যবস্থাপনার ঘাটতির একটি চিত্র।
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী বলেন, জাফলংয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে বেশ কিছু প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য বেঞ্চ স্থাপন, বসার স্থান উন্নয়ন এবং একটি ভিউ পয়েন্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবু সেলিম মাহমুদ-উল হাসান বলেন, সারাদেশের পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে সরকার বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। নতুন পরিকল্পনাও যুক্ত হচ্ছে। সিলেটসহ দেশের পর্যটনশিল্পকে একটি হাবে পরিণত করার লক্ষ্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেটের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্য ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে নিরাপদ যোগাযোগ, জরুরি চিকিৎসা, উদ্ধারব্যবস্থা, মোবাইল নেটওয়ার্ক, পরিচ্ছন্নতা, প্রশিক্ষিত গাইড এবং পর্যাপ্ত আবাসনসহ আধুনিক পর্যটনসেবা নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে সিলেটের পর্যটন খাত স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.