ছবি: সংগৃহীত
প্রযুক্তির অগ্রগতি যখন উল্কাবেগে ধাবিত হয়, তখন তার ছায়ায় গড়ে ওঠে অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিপ্লবের জোয়ারে আজ বিশ্ব ভাসলেও এর উজ্জ্বল সম্ভাবনার বিপরীতে ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে এক অদৃশ্য কিন্তু অতি বাস্তব কালো মেঘ। এআই আজ আর কেবল বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রতীক নয়; এটি নতুন অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক বিভাজন এবং নজরদারির আধুনিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যদি এই প্রযুক্তিকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা না হয়, তবে এটি মানব সভ্যতার গণতান্ত্রিক ও সামাজিক নিরাপত্তাকে ভঙ্গুর করে তুলতে পারে।
ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ছায়া ইতিহাস সাক্ষী, প্রতিটি প্রযুক্তির উদ্ভাবনই নতুন সুবিধা আর নতুন সংকট একসঙ্গে নিয়ে এসেছে। তবে এআইর রূপান্তর এত দ্রুত যে নীতিপ্রণেতা ও সমাজ বিশ্লেষকরা এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সামলে ওঠার আগেই নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জেনারেটিভ এআই ও আধুনিক অ্যালগরিদমের এই যুগে একদিকে যেমন উৎপাদনশীলতা বাড়ছে, অন্যদিকে নিঃশব্দে হানা দিচ্ছে গণছাঁটাই, সত্যের বিকৃতি এবং ব্যক্তিগত প্রাইভেসির চূড়ান্ত অবলুপ্তি।
কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মোহে অন্ধ হয়ে থাকলে চলবে না; বরং এআই কীভাবে মানবজাতির নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক অধিকারকে গ্রাস করছে; তার গভীর ও সমালোচনামূলক মূল্যায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
অটোমেশন ও গণছাঁটাইয়ের আশঙ্কা: শিল্পবিপ্লব কেবল মানুষের শারীরিক পরিশ্রমকে প্রতিস্থাপিত করেছিল, কিন্তু এআই সরাসরি আঘাত হানছে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের জায়গায়। ফলে প্রযুক্তিগত বেকারত্ব এখন আর কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়, এক আশঙ্কাজনক বাস্তব। আইটি সার্ভিস, কাস্টমার সাপোর্ট, বেসিক কোডিং, কনটেন্ট রাইটিং, ডাটা এন্ট্রি এবং অনুবাদ শিল্পের মতো খাতগুলো এআই অটোমেশনের প্রথম শিকার।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি কর্মসংস্থান এআই অটোমেশনের দ্বারা আংশিক বা সম্পূর্ণ প্রভাবিত হতে পারে। মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা এবং বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত আইটি জায়ান্ট সম্প্রতি হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে এআই-ভিত্তিক অটোমেশনে রূপান্তরকে চিহ্নিত করেছে।
সামাজিক বৈষম্য ও প্রতিকার: প্রযুক্তির কারণে যখন একটি বিশাল অংশের মানুষ চাকরি হারাচ্ছে, তখন মূলধনের মালিক ও বিগ টেক কোম্পানিগুলোর আয় বহুগুণ বাড়ছে। ফলে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তীব্রতর হচ্ছে। চিরাচরিত মেধাভিত্তিক শিক্ষার চেয়ে কর্মীদের রি-স্কিলিং বা নতুন এআই সরঞ্জামের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রশিক্ষণ জরুরি। এআইজনিত বেকারত্বের সামাজিক ধাক্কা সামলাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’ বা সবার জন্য ন্যূনতম সরকারি ভাতার মতো কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর আলোচনা চলছে।
সত্যের অপমৃত্যু ও সামাজিক বিভ্রান্তি: জেনারেটিভ এআইর সবচেয়ে ভীতিকর সৃষ্টি হলো ‘ডিপফেক’, যা নিমেষেই অসত্যকে অতি বাস্তবসম্মত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
গণতন্ত্রের ওপর আঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা
নির্বাচন ও রাজনীতিতে ডিপফেককে জনমত বানচালের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্লোভাকিয়ার নির্বাচন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীর ভুয়া অডিও বার্তা ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সময় ভুয়া সামরিক হামলা বা রাষ্ট্রপ্রধানের ভুয়া ঘোষণার মাধ্যমে শেয়ারবাজার পতন ও জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চক্রান্ত বাড়ছে।
সাইবার বুলিং ও সামাজিক সম্মানহানি ডিপফেক প্রযুক্তির সবচেয়ে কুৎসিত রূপ দেখা যাচ্ছে নারীদের বিরুদ্ধে এর অপব্যবহারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ছবি নিয়ে এআই অ্যাপের মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে আপত্তিকর ডিপফেক কনটেন্ট। এটি বিশ্বজুড়ে সাইবার বুলিং, ব্লাকমেইলিং এবং আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সামাজিক সংকট তৈরি করছে। এ ছাড়া আমাদের অজান্তেই প্রতিদিনের অনলাইন কর্মকাণ্ড, ছবি ও বার্তা স্ক্র্যাপ করে বিশাল বিশাল লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যা বৈশ্বিক প্রাইভেসির জন্য এক চরম হুমকি।
ডাটা স্ক্র্যাপিং ও নজরদারি পুঁজিবাদ বিগ টেক কোম্পানিগুলো কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত ফাইল, ডিজিটাল কথোপকথন ও ছবির ওপর ভিত্তি করে তাদের অ্যালগরিদম তৈরি করছে, যেখানে সাধারণ ব্যবহারকারীর সম্মতি নেওয়া হচ্ছে না। মানুষের সামাজিক আচরণ, রাজনৈতিক পছন্দ ও দুর্বলতা ট্র্যাক করে নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন বা রাজনৈতিক ফেক নিউজ প্রদর্শন করা হচ্ছে। যাকে প্রযুক্তিবিজ্ঞানী শোশানা জুবফ নজরদারি পুঁজিবাদ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
অ্যালগরিদমিক বৈষম্য এআই মূলত মানুষের তৈরি ডাটা থেকে শেখে। ফলে মানুষের সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বর্ণবাদ, লিঙ্গবৈষম্য ও আঞ্চলিক পক্ষপাতিত্ব এআইর সিদ্ধান্তে স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক নিয়োগ সফটওয়্যার বা ব্যাংক ঋণের অ্যালগরিদমে দেখা গেছে, এগুলো শ্বেতাঙ্গ বা নির্দিষ্ট সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর প্রতি ঝুঁকছে এবং কৃষ্ণাঙ্গ বা প্রান্তিক মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ দিচ্ছে।
সংকট উত্তরণে করণীয় এই ত্বরান্বিত ফ্রাঙ্কেনস্টাইনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পাশাপাশি প্রয়োজন আইনি ও কাঠামোগত প্রতিরোধ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রবর্তিত ‘ইইউ এআই এক্ট’র মতো বিশ্বব্যাপী কঠোর আইনি কাঠামো গঠন করতে হবে, যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ এআই ব্যবহারে জরিমানা ও নিষেধাজ্ঞার বিধান থাকবে।
এমনকি এআই দিয়ে তৈরি যে কোনো অডিও, ভিডিও বা কনটেন্টে বাধ্যতামূলক ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক থাকতে হবে, যেন সাধারণ মানুষ সহজে আসল-নকল পার্থক্য করতে পারে। এআই অপপ্রচার রুখতে উন্নত ডিপফেক ডিটেক্টর প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে ভুয়া তথ্য রিমুভ করার জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নাকি মানব সভ্যতার সারথি মেরি শেলির বিখ্যাত উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’-এর দৈত্যটির মতো এআই কি তার স্রষ্টাকেই ধ্বংস করে দেবে, নাকি মানুষ তার নীতি, সহমর্মিতা ও আইনি নিয়ন্ত্রণ দিয়ে এই মহাশক্তিকে ইতিবাচক পথে চালিত করতে পারবে—সেটিই আজ প্রশ্ন।
এআই কোনো অলৌকিক বা নিয়ন্ত্রণহীন মহাশক্তি নয়; এটি মানুষেরই তৈরি অ্যালগরিদম। প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য মানব জীবনের মান বাড়ানো, তাকে ধ্বংস করা নয়। তাই অন্ধ প্রযুক্তি-অনুরাগের ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা অবিলম্বে নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ, কঠোর আইনি প্রয়োগ এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রয়োগ ঘটাতে না পারি, তবে এআইর এই অন্ধকার দিক মানব সভ্যতার জন্য এক অপূরণীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.