ছবি সংগৃহীত :
জীবনের কিছু মুহূর্ত আসে, যখন চারপাশের সব দরজা যেন একে একে বন্ধ হয়ে যায়। আপন মানুষও তখন অসহায়, কোনো পথই খুঁজে পাওয়া যায় না
বুকভরা দুশ্চিন্তা আর অজানা আশঙ্কায় মন ভারী হয়ে ওঠে। মনে হয়, এই কঠিন সময় বুঝি আর শেষ হবে না।
অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে থাকেন মহান আল্লাহ।
দুঃখ-কষ্ট, বিপদ-আপদ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কখনো তা আসে পরীক্ষার মতো, কখনো সতর্কবার্তা হয়ে। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে একজন মুমিনের শক্তি হলো-সে জানে, পৃথিবীর সব পথ বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
তাই বিপদে ভেঙে পড়ার বদলে ধৈর্য ধরতে হয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হয় এবং কাঁদতে কাঁদতে তাঁর কাছেই সাহায্য চাইতে হয়।
আরও পড়ুন
আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকাই মুমিনের প্রশান্তি
আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকাই মুমিনের প্রশান্তি
নিঃশব্দ রাতের অন্ধকারে, মানুষের অগোচরে দু’হাত তুলে করা একটি দোয়া হয়তো কারও কাছে সামান্য মনে হতে পারে; কিন্তু একজন মুমিন জানেন, সেই হাত দুটিই তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়ের দিকে ওঠে। কারণ বিপদ থেকে মুক্তির প্রকৃত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব। আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫২)
বিপদের সময় তাই হতাশ হয়ে বসে থাকার পরিবর্তে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। নামাজ, দোয়া, জিকির ও ইসতেগফারের মাধ্যমে তাঁর সাহায্য চাইতে হবে। কোরআন ও হাদিসে এমন অনেক দোয়া ও আমলের কথা এসেছে, যা সংকটের সময়ে বান্দাকে আল্লাহর আরও কাছে নিয়ে যায়।
বেশি বেশি ইসতেগফার
কখনো বিপদ আসে নিজের ভুলের কারণে, আবার কখনো তা হয় আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। তাই বিপদে পড়লে প্রথমেই নিজের দিকে ফিরে তাকানো এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।
ইসতেগফার শুধু মুখের কিছু শব্দ নয়; এটি বান্দার অনুতপ্ত হৃদয়ের ভাষা। মানুষ যখন নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে বলে, ‘হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন’, তখন সে নিজের অহংকার ছেড়ে তার প্রকৃত আশ্রয়দাতার কাছে ফিরে যায়।
সহজভাবে পড়া যায়—
আস্তাগফিরুল্লাহ।
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
আরও পড়া যায়—
আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁর কাছেই তওবা করছি।
বিপদের সময় বেশি বেশি ইসতেগফার করা, তওবা করা এবং আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন তুলে ধরা একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমল।
সংকটে দোয়া ইউনুস
কখনো মানুষের মনে হয়, সে এমন এক অন্ধকারে আটকে গেছে, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। এমনই এক কঠিন অবস্থায় পড়েছিলেন হজরত ইউনুস (আ.)। তখন তিনি আল্লাহর কাছে যে দোয়া করেছিলেন, তা আজও বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য আশার এক অনন্য দোয়া।
দোয়াটি হলো—
লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমিন।
অর্থ: আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র ও মহিমান্বিত। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।
এই দোয়ায় একসঙ্গে রয়েছে আল্লাহর একত্বের স্বীকৃতি, তাঁর পবিত্রতার ঘোষণা এবং নিজের ভুলের স্বীকারোক্তি। সুনানে তিরমিজিতে এ দোয়ার ফজিলত সম্পর্কে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
তাই সংকট যত গভীরই হোক, মুমিনের উচিত হতাশ না হয়ে আল্লাহর দরজায় ফিরে যাওয়া। কারণ যে হৃদয় আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেয়, সে কখনো প্রকৃত অর্থে একা নয়।
‘ইয়া যাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম’ পাঠ
আল্লাহর মহিমা ও মর্যাদা স্মরণ করাও বান্দার অন্তরকে প্রশান্ত করে। ‘ইয়া যাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম’—অর্থাৎ মহিমা ও সম্মানের অধিকারী-আল্লাহর একটি মহান গুণবাচক নাম।
আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর কাছে দোয়া করা মানে নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে সর্বশক্তিমান সত্তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করা।
বিপদের সময়ে তাই দোয়া ও জিকিরের পাশাপাশি পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের প্রতি আরও যত্নবান হওয়া উচিত। সুযোগ হলে তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য নফল নামাজ আদায় করে নিজের কষ্ট, ভয়, দুশ্চিন্তা ও প্রয়োজনের কথা আল্লাহর কাছে তুলে ধরা যেতে পারে।
মানুষের কাছে সব কথা বলা সম্ভব হয় না। কিছু কষ্ট থাকে, যা কাউকে বলা যায় না। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কথাই গোপন নয়। চোখের পানি ঝরার আগেই তিনি হৃদয়ের ব্যথা জানেন।
ক্ষতি থেকে হেফাজতের দোয়া
জীবনে এমন অনেক বিপদ আসে, যা মানুষ আগে থেকে বুঝতে পারে না। তাই আল্লাহর কাছে সব ধরনের ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাওয়া উচিত।
সকাল ও সন্ধ্যায় পড়ার জন্য হাদিসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া এসেছে—
বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মা‘আসমিহি শাইউন ফিল আরদি, ওয়া লা ফিস-সামায়ি, ওয়া হুয়াস-সামিউল আলিম।
অর্থ: আল্লাহর নামে, যাঁর নামের সঙ্গে আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
সুনানে তিরমিজিতে সকাল ও সন্ধ্যায় এ দোয়া পাঠের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
বিপদে ভেঙে নয়, আল্লাহর দিকে ফিরুন
বিপদ মানুষকে ভেঙে দিতে পারে, আবার সেই বিপদই তাকে আল্লাহর আরও কাছে নিয়ে যেতে পারে। সিদ্ধান্তটা অনেকাংশেই নির্ভর করে আমরা বিপদের সময় কোন পথ বেছে নিই তার ওপর।
কষ্ট এলে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরতে হবে। চোখে পানি এলে কাঁদতে হবে-তবে মানুষের সামনে অসহায় হয়ে নয়, আল্লাহর সামনে সিজদায় গিয়ে। বুক ভারী হলে অভিযোগে নয়, দোয়ায় তা হালকা করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, দোয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে নিজের পছন্দের ফল পাওয়া নয়। কখনো আল্লাহ চাওয়া জিনিসটি দেন, কখনো কোনো বিপদ দূরে সরিয়ে দেন, আবার কখনো এমন কল্যাণ রাখেন যার খবর বান্দা তখনও জানে না।
তাই জীবনের সবচেয়ে কঠিন রাতেও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না।
হয়তো যে দরজাটি মানুষের কাছে বন্ধ, সেটিই আল্লাহর কাছে আপনার জন্য খুলে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে।
বিপদ যত বড়ই হোক, মুমিনের ভরসা তার চেয়েও বড়-আল্লাহ আছেন। আর যে হৃদয় সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখে, কঠিন সময়ও একদিন তার জন্য রহমতের বার্তা হয়ে আসে।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.