ছবি: সংগৃহীত
পুরুষের ত্বকের যত্ন বলতে অনেকের মাথায় প্রথমেই আসে ফেসওয়াশ, ময়েশ্চারাইজার আর শেভিংয়ের পর কোনো একটি ক্রিম। ত্বকের পরিচর্যার বিষয়টি যেন সেখানেই শেষ।
অথচ পুরুষের ত্বকের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার কারণে নিয়মিত যত্নের পাশাপাশি শরীরের ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
পুরুষদের ত্বক সাধারণত নারীদের তুলনায় কিছুটা পুরু ও বেশি তৈলাক্ত।
রোমকূপও তুলনামূলকভাবে বড় হতে পারে। এর সঙ্গে টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রভাব এবং নিয়মিত শেভ করার কারণে ত্বকে অতিরিক্ত তেল, ব্রণ কিংবা জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই শুধু বাইরে থেকে প্রসাধনী ব্যবহার নয়, ত্বকের সুস্থতার জন্য খাবারের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক পুরুষকেই আলাদা করে নানা ধরনের সাপ্লিমেন্ট খেতে হবে।
সুষম ও পুষ্টিকর খাবার থেকেই শরীরের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ পুষ্টি পাওয়া সম্ভব। কোনো নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে বা চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে তবেই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
ত্বকের দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতার সঙ্গে কোলাজেনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরে প্রাকৃতিকভাবে কোলাজেন তৈরির পরিমাণ কমতে থাকে। কিছু গবেষণায় কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট ত্বকের আর্দ্রতা ও টানটান ভাব ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে সবার জন্য এর প্রয়োজনীয়তা এক নয়।
ত্বকের যত্নে ভিটামিন সি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট। এটি শরীরে কোলাজেন তৈরির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের কারণে কোষের ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় সহায়তা করতে পারে।
সাপ্লিমেন্টের আগে খাবারের দিকেই নজর দেওয়া ভালো। আমলকি, পেয়ারা, কমলালেবু, লেবু, ক্যাপসিকামসহ বিভিন্ন ফল ও সবজিতে ভিটামিন সি পাওয়া যায়।
ত্বকে প্রদাহের প্রবণতা থাকলে খাদ্যতালিকায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের উৎস রাখা যেতে পারে। শরীরে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে। তৈলাক্ত ত্বকের ক্ষেত্রে সেবাম বা প্রাকৃতিক তেলের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণেও ওমেগা-৩ উপকারী হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
ত্বকের স্বাভাবিক গঠন এবং ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়ায় জিঙ্ক প্রয়োজনীয় একটি খনিজ। শরীরে এর ঘাটতি দেখা দিলে ত্বকের নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তবে ব্রণ হয়েছে বা ত্বকে সমস্যা দেখা দিয়েছে বলেই নিজের ইচ্ছায় জিঙ্ক সাপ্লিমেন্ট শুরু করা উচিত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট হিসেবে ভিটামিন ই শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। বাদাম, বীজসহ বিভিন্ন খাবারে ভিটামিন ই পাওয়া যায়। তাই প্রতিদিনের খাবারে এসব পুষ্টিকর উপাদান রাখা যেতে পারে। আলাদা করে ভিটামিন ই সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
চুল ও নখের যত্নে বায়োটিনের কথা বেশি শোনা গেলেও ত্বকের জন্যও এর প্রয়োজন রয়েছে। শরীরে বায়োটিনের ঘাটতি থাকলে ত্বক শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যেতে পারে। দেখা দিতে পারে লালচে র্যাশ, প্রদাহ কিংবা ঠোঁটের কোণে ফাটার মতো সমস্যাও।
শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ত্বকের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতেও ভিটামিন ডি প্রয়োজন। এই ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে ত্বকে প্রদাহ বাড়তে পারে এবং ক্ষত সারতেও সময় বেশি লাগতে পারে। ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতাও কমে যেতে পারে।
ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে ঘাটতি আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শরীরের অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যের সঙ্গেও ত্বকের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে ত্বকের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। ব্রণ, একজিমা, সোরিয়াসিস কিংবা রোজেশিয়ার মতো কিছু ত্বকের সমস্যার সঙ্গে অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে। তাই অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে হায়ালুরোনিক অ্যাসিডের ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে শেভ করার পর ত্বকে যে শুষ্কতা, টানটান ভাব বা অস্বস্তি তৈরি হয়, তা কমাতে হায়ালুরোনিক অ্যাসিডযুক্ত পণ্য সহায়ক হতে পারে। ত্বককে আর্দ্র ও কোমল রাখার পাশাপাশি ত্বকের সতেজ চেহারা ধরে রাখতেও এটি ব্যবহৃত হয়।
ত্বকের যত্নে সাপ্লিমেন্টকে জাদুকরী সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ত্বকের সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত পানি পান, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নিজের ত্বকের ধরন অনুযায়ী সঠিক প্রসাধনী ব্যবহার, সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে কোনো ভিটামিন বা মিনারেলের ঘাটতি নির্ণয় না করে নিজের ইচ্ছায় একাধিক সাপ্লিমেন্ট শুরু করা ঠিক নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ভালো।
পুরুষের ত্বকের যত্ন তাই শুধু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ফেসওয়াশ কিংবা ক্রিম ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ত্বকের সুস্থতা অনেকটাই নির্ভর করে শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার ওপর। বাইরে থেকে যত্নের পাশাপাশি ভেতর থেকেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারলেই ত্বক থাকতে পারে সতেজ ও সুস্থ।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.