ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের পরিবেশ, ড্রেনেজ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
এবার এসব সমস্যার দ্রুত সমাধানে সময় বেঁধে দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। আগামী সাত দিনের মধ্যে ওসমানী হাসপাতালের ড্রেনেজ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এ নির্দেশের কথা জানান।

হাসপাতালের চিকিৎসকদের সময়ানুবর্তিতা নিয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি। নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক বিজ্ঞপ্তিতে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। বায়োমেট্রিক হাজিরার তথ্য পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে সেখানে নির্ধারিত সময়ের পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চিকিৎসক কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকা এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মস্থল ছাড়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
এর মধ্যেই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সরাসরি পরিদর্শন এবং সাত দিনের সময়সীমা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ওসমানী হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা।

দালালমুক্ত হবে সরকারি হাসপাতাল
শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, সরকারি হাসপাতালে রোগী হয়রানির অন্যতম কারণ হিসেবে দালালদের দৌরাত্ম্যের কথাও তুলে ধরেছেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালকে দালালমুক্ত করা হবে। একটি শ্রেণি রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। এতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা একদিকে যেমন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে বাড়তি খরচের বোঝাও বহন করছেন।
দালালদের বিরুদ্ধে র্যাব ও ডিজিএফআই যৌথভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। বিভিন্ন হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়াও চলছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যে সরকারি হাসপাতালের সেবা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগই সামনে এসেছে। রোগী ও স্বজনদের অনেকের অভিযোগ, হাসপাতালের ভেতর ও আশপাশে সক্রিয় একটি চক্র রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা, চিকিৎসা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে।
অবৈধ ক্লিনিকেও অভিযান
অবৈধ ক্লিনিক ও ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনদের মাধ্যমে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। অবৈধ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে সিলগালা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ভুয়া চিকিৎসক ও সনদধারী নয় এমন টেকনিশিয়ান দিয়ে অস্ত্রোপচার করানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্য খাতের এসব অনিয়ম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় প্রয়োজন উল্লেখ করে মন্ত্রী ছয় মাস সময় দেওয়ার আহ্বান জানান।

২৫টির বেশি হাসপাতাল পরিদর্শন
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক মাসে তিনি দেশের ২৫টির বেশি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। প্রায় সব হাসপাতালেই চিকিৎসকদের উপস্থিতি সন্তোষজনক পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
রোগীদের সঙ্গেও কথা বলেছেন জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, চিকিৎসকদের আচরণ আগের তুলনায় ভালো হয়েছে বলে রোগীরা জানিয়েছেন। হাসপাতালের খাবারের মানও উন্নত হয়েছে।
তবে ওসমানী হাসপাতাল নিয়ে তাঁর সাত দিনের নির্দেশের তাৎপর্য আলাদা। কারণ, এটি শুধু একটি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা বা ড্রেনেজের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে চিকিৎসকদের সময়ানুবর্তিতা, রোগী ব্যবস্থাপনা এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।
বাদ পড়া শিশুদের আবারও হাম টিকা
এদিকে হামের টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের জন্য চলতি মাসের শেষ দিকে আবারও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নানা কারণে কিছু শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা নিতে পারেনি। কেউ তথ্যের অভাবে, কেউ কাজের কারণে, আবার কেউ স্কুলে থাকার কারণে টিকা থেকে বাদ পড়েছে। বাদ পড়া এসব শিশুকে শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।
সিলেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বাইরে তিন হাজারের বেশি শিশুকে নতুন করে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। হাওর এলাকার শিশুদের টিকাদানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চলতি মাসের শেষ দিকে দেশব্যাপী আবারও বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচি চালুর কথা জানান মন্ত্রী।
এখন নজর সাত দিনে
ওসমানী হাসপাতাল নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর এখন মূল প্রশ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে। সাত দিনের মধ্যে ড্রেনেজ ও পরিচ্ছন্নতার সমস্যা কতটা সমাধান হয়, চিকিৎসকদের সময়ানুবর্তিতা কতটা নিশ্চিত করা যায় এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্রের বিরুদ্ধে কী ধরনের দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই দেখার বিষয়।
দেশের স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকটের চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতি ১১,০০০ থেকে ১২,০০০ মানুষের বিপরীতে মাত্র একজন ডাক্তার বা নার্স নিয়োজিত রয়েছেন। এই সীমিত জনবল নিয়েই স্বাস্থ্যকর্মীরা দিন-রাত বিরামহীনভাবে রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’
এর আগে হাসপাতালের কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
পরিদর্শনকালে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরী, ওসমানী হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.