প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ১১:১৩ (শনিবার)
সিলেটে ৩ খুন: জমি বিরোধের অভিযোগ মেয়ের

সিলেটে নগরীতে বাসায় ঢুকে স্বামী - স্ত্রী  ও তাদের গৃহকর্মীকে নৃশংস খুনের ঘটনায় জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের কথা উল্লেখ করে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নিহত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা। তার অভিযোগ, স্বত্বসংক্রান্ত একটি মামলা প্রত্যাহারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এর জেরেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে তার বাবা, মা ও গৃহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে

 

 

 

তবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া বাবুল মিয়ার নাম সেলিনা সুলতানার দেওয়া অভিযোগে নেই।
 

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাতে সিলেট কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগে এসব কথা উল্লেখ করেন সেলিনা। অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৩ আগস্ট যুক্তরাজ্য থেকে দেশে আসেন।

সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মো. মঈনুল জাকির অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি এদিনকে নিশ্চিত করেছেন।

অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৭ সালে সেলিনা ও তার বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি সিলেটের কাছ থেকে রিকাবী বাজারের সরমপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন। ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম তাদের লিজ নেওয়া জমিসহ সমিতির ৮০ শতক জমি ইম্পালস বিল্ডার্সের নামে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিল করেন এবং নামজারি করে মালিকানা দাবি করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এ নিয়ে ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন সেলিনার বাবা। পরে মামলাটি স্বত্ব-২১১/২০২৩ নম্বরে রূপান্তরিত হয়ে যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সেলিনার দাবি, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ও তার বাবাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালে সিরাজুল ইসলাম সেলিনার বাবা এম এ সাত্তার, মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির বর্তমান চেয়ারম্যান জমিংথাংগা লুসাইসহ কয়েকজন লিজগ্রহীতার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন। মামলাটি অতিরিক্ত জেলা জজ ৫ম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেলিনা অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সিরাজুল ইসলাম আমিন হোসেনসহ কয়েকজনকে নিয়ে তার বাবার বাসায় গিয়ে স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে মামলাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সিরাজুল ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেন। এ ঘটনায় তৌহিদুল ইসলাম থানায় অভিযোগ করেন। পরে প্রতিকার না পেয়ে ৬ আগস্ট ২০২৫ আদালতে কোতোয়ালি সিআর ১০৫৭/২০২৫ নম্বর মামলা করেন। মামলাটি ডিবি সিলেট তদন্ত করছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

সেলিনার অভিযোগ, সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই মুখ্য জেলা জজ ২য় আদালতে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমি-সংক্রান্ত স্বত্ব ৭৩/২৩ মামলার শুনানির সময় তার বাবার নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়। ৩০ জুলাই তার বাবা আদালতে গেলে তাকেও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রের সবচেয়ে গুরুতর অংশে সেলিনা বলেন, স্বত্ব মামলা থেকে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিলটি রক্ষা করার জন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে তার বাবা এম এ সাত্তার, মা সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়েছে। গত ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় তাদের হত্যা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাসা থেকে কাগজপত্র, জিডির কপি ও দলিলাদি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

সেলিনা বলেন, যুক্তরাজ্য থেকে দেশে এসে বাবা-মায়ের দাফন-কাফন শেষে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করে অভিযোগ দিতে তার বিলম্ব হয়েছে।
অভিযোগের শেষাংশে তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া কাগজপত্র ও দলিলাদি উদ্ধারের দাবি জানান।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা  (ওসি) খান মো. মঈনুল জাকির বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে।’

এজাহারে বাবুলের নাম না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। সুতরাং, অভিযোগে বাবুলের নাম না থাকা এবং হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার বিষয়টি, দুটিই আমরা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করব।’

উল্লেখ্য, বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) ও গৃহকর্মী তাহমিনার (১৫) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর ওইদিন বিকেলে সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়া (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির মৃত নূর মিয়া (কবিরাজ)-এর ছেলে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় বাবুল মিয়াকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছেন, তিনি ওই বাসায় রং করার কাজ করেছিলেন। এ সূত্রে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার পরিচয় ও যোগাযোগ হয়। পুলিশের ভাষ্য, তাহমিনার কোনো আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বাবুল প্রথমে তাকে এবং পরে একে একে আরও দুজনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন। এরপর বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান বলে পুলিশকে জানিয়েছেন বাবুল।