প্রকাশিত: ০১ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৩১ (রবিবার)
তীব্র বিরোধিতায় বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগে পিছু হটল ফিফা

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা, বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি এবং নিজেদের ভেতর থেকেই বাড়তে থাকা চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। বিশ্বকাপসহ বড় টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্ব পরিচালনার জন্য পৃথক প্রতিষ্ঠান গঠন করে সেখানে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

শনিবার এক বিবৃতিতে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান ইনফান্তিনো বলেছেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য সব সময়ই একই ছিল এবং ভবিষ্যতেও তা থাকবে। আমাদের উদ্দেশ্য সব সময়ই ছিল সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং ফুটবলের উন্নয়ন করা।

কিন্তু সবার মতামত শোনার পর পরিষ্কার হয়েছে, এই প্রস্তাব সেই লক্ষ্য পূরণে সহায়ক নয়। তাই এটি আর সামনে এগোবে না।

গত মঙ্গলবার ফিফা সদস্য দেশগুলোর কাছে ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাঠায়। প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের এই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার তহবিল গঠনের পরিকল্পনা ছিল।

সেই অর্থ থেকে চার বছরের চক্রে প্রতিটি সদস্য দেশকে ৪ কোটি ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিল ফিফা।

প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ক্যাপিটাল এই প্রকল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জশুয়া কুশনার, যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। আর পুরো আর্থিক ও বাণিজ্যিক কাঠামো গড়ে তুলতে ফিফার সহযোগী হিসেবে থাকার কথা ছিল বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগানের।

ফিফার পরিকল্পনা ছিল, সদস্য দেশগুলোর অনুমোদন মিললে এই উদ্যোগের মাধ্যমে ১০ বিলিয়ন (১,০০০ কোটি) ডলারের একটি তহবিল গঠন করা হবে। সেখান থেকে প্রতিটি সদস্য দেশ চার বছরের চক্রে ৪ কোটি (৪০ মিলিয়ন) ডলার করে পেত। এর মধ্যে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারিতেই ২ কোটি ডলার ছাড় করার পরিকল্পনা ছিল, আর বাকি অর্থ ধাপে ধাপে দেওয়া হতো। বর্তমানে ফিফার প্রতিটি সদস্য দেশ চার বছরের উন্নয়ন চক্রে ৮০ লাখ ডলার করে অনুদান পেয়ে থাকে।

কিন্তু পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা প্রথমেই এর বিরোধিতা করে বলে  , বিশ্বকাপ কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়। এমনকি প্রয়োজনে ফিফার টুর্নামেন্ট বয়কটের হুঁশিয়ারিও দেয় তারা।

উয়েফার পর একই অবস্থান নেয় উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। এক বিবৃতিতে এএফসি জানায়, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শক্তি এর সার্বজনীনতা এবং সব কনফেডারেশনের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তাই প্রতিযোগিতার ঐক্য ও মৌলিক চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এমন যেকোনো প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

তিনটি কনফেডারেশনের সম্মিলিত সদস্য দেশের সংখ্যা ১৩০-এর বেশি। ফলে তাদের সম্মিলিত বিরোধিতায় ফিফার পরিকল্পনা অনুমোদনের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। কারণ ফিফার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এমন কোনো প্রস্তাব পাস করতে ২১১ সদস্য দেশের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন প্রয়োজন।

শুধু বাইরে নয়, ফিফার ভেতরেও এ নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। সংস্থাটির দীর্ঘদিনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস করদেইরো এই পরিকল্পাকে ‘ফুটবলের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখা’ আখ্যা দিয়ে পদত্যাগ করেন। পরে ফিফার চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুরও প্রকাশ্যে পরিকল্পাটির সমালোচনা করেন।

সমালোচনা ও বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে ইনফান্তিনো বলেন, ‘আগামী দিনে ফুটবলের প্রতি আমাদের সবার অভিন্ন স্বার্থকে সামনে রেখে সব পক্ষকে আবার এক জায়গায় নিয়ে আসতে চাই। একই সঙ্গে যেসব দেশে ফুটবলের আরও উন্নয়ন প্রয়োজন, সেখানে কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে।’