প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ১৬:২৮ (মঙ্গলবার)
নাক-কান-গলার ক্যানসার: সচেতনতা থেকে কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন

ছবি: সংগৃহীত

আজ ২৭ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব হেড-নেক ক্যানসার দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘From Awareness to Action: One World, One Voice Against Head & Neck Cancer’, যার বাংলা ভাবার্থ ‘সচেতনতা থেকে কার্যকর পদক্ষেপ: হেড-নেক ক্যানসারের বিরুদ্ধে এক বিশ্ব, এক কণ্ঠ।’

এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো, শুধু সচেতনতা তৈরি করলেই হবে না; সেই সচেতনতাকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে। মুখ, নাক, গলা, জিহ্বা, স্বরযন্ত্র বা ঘাড়ে দীর্ঘদিন ধরে কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে রোগমুক্তির সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

হেড-নেক ক্যানসার বলতে মুখগহ্বর, ঠোঁট, জিহ্বা, মাড়ি, গালের ভেতরের অংশ, মুখের তালু, টনসিল, স্বরযন্ত্র (ল্যারিংস), নাক ও সাইনাস, নাসোফ্যারিংস, লালাগ্রন্থি এবং ঘাড় অঞ্চলের বিভিন্ন অঙ্গের ক্যানসারকে বোঝায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনও একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে—‘অপারেশন করলে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে।’ এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণে অনেক রোগী সময়মতো অস্ত্রোপচার করাতে দেরি করেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যখন সম্পূর্ণভাবে ক্যানসার অপসারণের সুযোগ আর থাকে না।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়া অধিকাংশ হেড-নেক ক্যানসারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারই সবচেয়ে কার্যকর ও প্রধান চিকিৎসা। সময়মতো অপারেশন রোগমুক্তির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবনের সুযোগ সৃষ্টি করে।

অনেক রোগী সফল অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রেডিওথেরাপি বা কেমোরেডিওথেরাপি নিতে অনীহা প্রকাশ করেন কিংবা মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন। অথচ অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর হিস্টোপ্যাথলজি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রেডিওথেরাপি বা কেমোরেডিওথেরাপি চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ। এই চিকিৎসা অবশিষ্ট অণুবীক্ষণিক ক্যানসার কোষ ধ্বংস করে রোগ পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই অস্ত্রোপচার সফল হলেও চিকিৎসা সেখানেই শেষ নয়; চিকিৎসকের নির্ধারিত পুরো চিকিৎসা পরিকল্পনা সম্পন্ন করাই রোগমুক্তির সম্ভাবনা সর্বাধিক বাড়ায়।

হেড-নেক ক্যানসারের সফল চিকিৎসার জন্য প্রথম শর্ত হলো নির্ভুল রোগ নির্ণয়। এজন্য প্রয়োজনে অভিজ্ঞ প্যাথলজিস্টের মাধ্যমে এফএনএসি বা বায়োপসি) করে রোগ নিশ্চিত করা, দক্ষ রেডিওলজিস্টের তত্ত্বাবধানে সিটি স্ক্যান বা এমআরআই করে রোগের বিস্তার নির্ণয় এবং রোগের পর্যায় অনুযায়ী অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি অথবা সমন্বিত চিকিৎসা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সঠিক রোগ নির্ণয় ও যথাযথ চিকিৎসা পরিকল্পনাই রোগীর সর্বোত্তম ফল নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

প্রতিপাদ্যের ‘One World’ অংশটি মনে করিয়ে দেয়, হেড-নেক ক্যানসার কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জ। এই রোগ মোকাবিলায় চিকিৎসক, রেডিওথেরাপিস্ট, স্বাস্থ্যকর্মী, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য।

অন্যদিকে ‘One Voice Against Head & Neck Cancer’ অংশটি একটি অভিন্ন বার্তার প্রতীক—তামাক ও ধূমপান বর্জন, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে চলা, সন্দেহজনক লক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ। এই সমন্বিত উদ্যোগই বিশ্বজুড়ে হেড-নেক ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।

হেড-নেক ক্যানসারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। যেমন—ঘাড়ে গোটা বা ফোলা, মুখের ঘা তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হওয়া, স্বর ভেঙে যাওয়া বা কণ্ঠস্বর বসে যাওয়া, গিলতে কষ্ট হওয়া এবং মুখের ভেতরে সাদা বা লাল দাগ দেখা দেওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে একজন ইএনটি ও হেড-নেক সার্জনের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বিশ্ব হেড-নেক ক্যানসার দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—সচেতনতা তখনই অর্থবহ, যখন তা বাস্তব পদক্ষেপে পরিণত হয়। তাই ভয় বা গুজবে নয়, আস্থা রাখুন চিকিৎসাবিজ্ঞানে। সময়মতো রোগ নির্ণয়, সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং সম্পূর্ণ চিকিৎসা গ্রহণই হেড-নেক ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।

লেখক: ডা. মো. আব্দুল হাফিজ (শাফী), সহকারী অধ্যাপক, নাক-কান-গলা বিভাগ, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল