প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬ ১৯:২৯ (সোমবার)
হবিগঞ্জ জেলা কারাগার অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়া!

ছবি: সংগৃহীত

অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে হবিগঞ্জ জেলা কারাগার-এমন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অনিয়মের মাধ্যমে জেলা কারাগারের জেল সুপার মুজিবুর রহমানসহ একটি সিন্ডিকেট বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। কারাগারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সিট বাণিজ্য, ওয়ার্ড বাণিজ্য, মোবাইল কল বাণিজ্য, সাক্ষাৎ বাণিজ্য এবং বন্দিদের খাবার চড়া দামে ক্যান্টিনে বিক্রিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি জেল ফেরত মো. সামছুদ্দিন নামে এক ব্যক্তি এসব অনিয়মের অভিযোগ এনে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন), ঢাকাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। সামছুদ্দিন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের বাসিন্দা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে সিট বাণিজ্য মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের অন্যতম আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কারাগারের হাসপাতালে একটি বেড পেতে অসুস্থ হওয়া বা নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণের প্রয়োজন হয় না; বরং প্রতি মাসে ৬ থেকে ১২ হাজার টাকা দিতে হয়। কেউ কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের সিট বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

কারাগারের আরেকটি অনিয়মের অভিযোগ সাক্ষাৎ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। কারাবিধি অনুযায়ী, কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে অর্থের বিনিময়ে সেই নিয়ম উপেক্ষা করে বিশেষ সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিলেই বিশেষ সাক্ষাতের সুযোগ মেলে এবং প্রতিদিন অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি এ সুবিধা পান বলে অভিযোগ রয়েছে।

কারাগারের খাবার নিয়েও দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। বন্দিদের নিম্নমানের খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি ক্যান্টিনে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে খাদ্যপণ্য বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ। অভিযোগকারীদের দাবি, ক্যান্টিনের বিক্রি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সরকারি খাদ্যনীতির যথাযথ অনুসরণ করা হয় না এবং বন্দিদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, বাইরে যখন কাঁচা মরিচের দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকা, তখন ক্যান্টিনে ১০০ গ্রাম কাঁচা মরিচ ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি করা হয়। একইভাবে বাজারে পেঁয়াজের দাম ৪০ টাকা হলেও ক্যান্টিনে ১ কেজি পেঁয়াজ ১৪০ টাকায় বিক্রি করা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, খাবারসহ বিভিন্ন পণ্যে অতিরিক্ত মূল্য আদায় করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে জেল সুপার মুজিবুর রহমান, সুবেদার বিলাল, সুবেদার মিজান, প্রধান রক্ষী ইকবালসহ একটি সিন্ডিকেট জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী সামছুদ্দিন বলেন, কারাগারের ভেতরে এমন কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি নেই, যা হয় না। টাকা দিলে সবই মেলে। সিট বাণিজ্য, ওয়ার্ড বাণিজ্য, মোবাইল কল বাণিজ্য, সাক্ষাৎ বাণিজ্য, বন্দিদের খাবার চড়া দামে বিক্রি এবং প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়।

জাকির হাসান নামে জেল ফেরত এক যুবক বলেন, সম্প্রতি আমি একটি রাজনৈতিক মামলায় দেড় বছর হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে ছিলাম। সেখানকার খাবারের মান এতটাই খারাপ ছিল যে তা খাওয়া কঠিন। টাকা দিলে জেলে বাসাবাড়ির মতো আরামেও থাকা যায়।

হাবিব মিয়া নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, কারাগারের ভেতরে কর্তৃপক্ষের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। তাদের অনিয়মই সেখানে নিয়মে পরিণত হয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হবিগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার মুজিবুর রহমান বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনো সত্যতা নেই।