ছবি সংগৃহীত :
নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর সিলেটে রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী সংগঠন, নারী উদ্যোক্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ বাজেটকে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সময়োপযোগী, ব্যবসাবান্ধব ও উন্নয়নমুখী বলে অভিহিত করেছেন। আবার কেউ বলেছেন, শুধু বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে আরও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছেন তারা।
বাজেট ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার (১১ জুন) নগরীর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক কার্যালয়, সামাজিক সংগঠন ও পেশাজীবী মহলে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতের অনেক বাজেটেই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতায় প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি। তাই এবারের বাজেটের সফলতাও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করবে।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি ধরে রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, কর কাঠামো সহজীকরণ, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক গতি ফিরে আসতে পারে।
সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির কোষাধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম তুহিন বলেন, তার কাছে এবারের বাজেট সময়োপযোগী, ব্যবসাবান্ধব এবং জনকল্যাণমুখী বলে মনে হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, এসব খাতের উন্নয়ন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বিলাসী ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর বাড়ানো হলেও সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হয়নি বলে তিনি মনে করেন। এতে একদিকে রাজস্ব আহরণের সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তার স্বার্থও সুরক্ষিত থাকবে।
জহিরুল ইসলাম তুহিন আরও বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও উৎপাদনমুখী খাতের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা রাখা হয়েছে। বর্তমানে বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার প্রায় ১৪ শতাংশ হলেও অনেক ক্ষেত্রে ৪ থেকে ৮-৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি নতুন উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। সব মিলিয়ে তিনি বাজেটকে বিনিয়োগ-সহায়ক ও ব্যবসাবান্ধব হিসেবে দেখছেন।
তবে নারী উদ্যোক্তারা বাজেটে ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্পখাতের (সিএমএসএমই) জন্য বরাদ্দকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়ন নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
সিলেট উইমেন চেম্বারের সভাপতি লুবানা ইয়ামিন শম্পা বলেন, সিএমএসএমই খাতের জন্য উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিভিন্ন তহবিলের আওতায় কয়েকশ কোটি টাকার বরাদ্দের বিষয়টিও ইতিবাচক। কিন্তু বাজেট তখনই উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর হবে, যখন মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যাবে।
তিনি বলেন, অতীতে দেখা গেছে বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহায়তা কর্মসূচি অনুমোদন পেলেও অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক পর্যায়ে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি। ফলে ঘোষিত সুবিধার পুরোটা বাস্তবে কাজে লাগেনি। তাই বাজেট কতটা উদ্যোক্তাবান্ধব হয়েছে, তা বাস্তবায়নের পরই মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
কৃষি খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিবছরই এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে সিলেট অঞ্চলের অনেক কৃষক ও উদ্যোক্তা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। বরাদ্দের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে সরকারের আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাজেটকে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন সরকারপক্ষের প্রতিনিধিরা।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, জনগণের প্রত্যাশা ও উন্নয়ন চাহিদার প্রতিফলন ঘটিয়ে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ঘাটতি দূর করার লক্ষ্যেই অবকাঠামো ও জনসেবামুখী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রেল যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, সড়ক অবকাঠামো এবং গ্রাম-শহরের সমন্বিত উন্নয়নের জন্য ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর মতে, বাজেটে ঘোষিত কর্মসূচি ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। জনগণের কল্যাণ এবং জীবনমান উন্নয়নই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।
এদিকে সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দকে কার্যকরভাবে ব্যয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা (পোহাস)-এর সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, এবারের বাজেটে হাওরাঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়া ইতিবাচক উদ্যোগ। পাশাপাশি হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দকেও স্বাগত জানান তিনি।
তবে তিনি বলেন, হাওরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু অভিযোজন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য তাদের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের দাবি জানানো হয়েছিল। সে তুলনায় বর্তমান বরাদ্দ সীমিত হলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
কাসমির রেজা আরও বলেন, ঘোষিত বরাদ্দের স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। যাতে প্রকৃত উপকারভোগী—বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ, কৃষক ও মৎস্যজীবীরা এর সুফল পান। অতীতে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
সামগ্রিকভাবে বাজেট নিয়ে সিলেটে আশাবাদ ও সংশয় দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই দেখা গেছে। তবে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, রাজনৈতিক নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অধিকাংশই একমত যে, বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের ওপর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবেন।
আইটি ল্যাব সলিউশন্স লি.